আদানি-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ চুক্তি

আদানি-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ চুক্তি
অসম শর্তের চাপে ধুঁকছে জ্বালানি খাত

২০১৭ সালে শেখ হাসিনার আমলে সই হওয়া আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) আজ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়। ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত ১,৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক এই কেন্দ্র থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ দেশের চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ মেটালেও, এর মূল্য ও শর্তাবলি নিয়ে সরকারি পর্যায়েই এখন প্রশ্ন উঠেছে।

জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির (NRC) প্রতিবেদন যা বলছে
অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের যে কমিটি এই চুক্তি পর্যালোচনা করেছে, তাদের ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদনে বেশ কিছু গুরুতর অসংগতির কথা উঠে এসেছে:

<cite index="2-1">গোড্ডা প্ল্যান্টের বিদ্যুতের দাম তার নিকটতম বেসরকারি প্রতিযোগীর চেয়ে ৩৯.৭ শতাংশ বেশি, এবং ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের মধ্যে এই চুক্তিতেই সবচেয়ে বেশি ব্যয়বৃদ্ধি ঘটেছে।</cite>
<cite index="2-1">কমিটির ভাষায়, বাংলাদেশ যে দাম দিচ্ছে তা প্রকৃত ন্যায্য দামের চেয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি, যা দেশের সীমান্ত-বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ আমদানি খাতে সবচেয়ে বড় ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।</cite>
<cite index="2-1">চুক্তির একটি অস্বাভাবিক দিক হলো, ভারতের কর্পোরেট করের বোঝা বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপানো হয়েছে — যেখানে আন্তর্জাতিক প্রথা অনুযায়ী নিজ দেশের কর নিজ দেশেই বহন করার কথা।</cite>
কমিটি একে "নির্দিষ্ট চুক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল" বলে উল্লেখ করে জানিয়েছে, চুক্তি প্রদানের প্রক্রিয়াতেই গুরুতর অসংগতি পাওয়া গেছে।

আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ
এই একটি চুক্তির কারণেই বাংলাদেশের বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি বিশাল:

<cite index="6-1">পর্যালোচনা কমিটির হিসাব অনুযায়ী, আদানি চুক্তির কারণে বাংলাদেশের বছরে প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা বাড়তি ক্ষতি হচ্ছে, যা মার্কিন ডলারে ৪০০-৫০০ মিলিয়নের সমান।</cite>
<cite index="6-1">বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (PDB) লোকসান ২০১৫ সালের ৫,৫০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৫০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে।</cite>
<cite index="6-1">বর্তমানে বিদ্যুৎ কেনা হচ্ছে প্রতি ইউনিট ১২.৩৫ টাকায়, অথচ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬.৬৩ টাকায় — অর্থাৎ প্রতিটি ইউনিটেই বিপুল ভর্তুকির বোঝা।</cite>
<cite index="6-1">এমনকি জ্বালানি বা অবকাঠামোগত কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকা সত্ত্বেও বছরে ৭,৭০০-৯,৫০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে, অথচ শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদই বছরে ৯৯,০০০ থেকে ১,৬৫,০০০ কোটি টাকা গুনতে হচ্ছে।</cite>
এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়, সমস্যাটা শুধু আদানির একক চুক্তি নয় — এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সংকটের অংশ, যেখানে জরুরি ভিত্তিতে সই হওয়া একাধিক বিদ্যুৎ চুক্তি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চেয়ে বেসরকারি স্বার্থকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।

মূল্য বৈষম্যের তুলনামূলক চিত্র
আদানির দাম অন্য উৎসের সঙ্গে তুলনা করলে বৈষম্যটা আরও স্পষ্ট হয়:

<cite index="8-1">ভারতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো ইউনিটপ্রতি ৫.৫ টাকা (০.০৪৫ ডলার), নেপালি সরবরাহকারীরা ৮ টাকা এবং ভারতের অন্যান্য বেসরকারি উৎপাদক ৮.৫ টাকায় বিদ্যুৎ বিক্রি করে — অথচ আদানির কাছ থেকে কেনা বিদ্যুতের দাম ১৪ টাকার বেশি।</cite>
<cite index="9-1">রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানি করা গড় বিদ্যুতের তুলনায় আদানির বিদ্যুতের দাম প্রায় ৫৫ শতাংশ বেশি।</cite>
চুক্তির ক্ষমতা-ভারসাম্যহীনতা ও সরবরাহ-সংকট
এই চুক্তির অসমতা শুধু মূল্যেই সীমাবদ্ধ নয়, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ কার্যত দুর্বল অবস্থানে থেকেছে:

<cite index="9-1">২০২৪ সালের অক্টোবরে বকেয়া বিল পরিশোধে বিলম্বের কারণে আদানি সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে আনে, যার ফলে একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে প্ল্যান্টটি মাত্র ৪২ শতাংশ সক্ষমতায় চলতে থাকে — এই সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আরও প্রকট আকার নেয়।</cite>
অর্থাৎ, বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে যখন দেশ সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে, ঠিক তখনই একটি একক সরবরাহকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে জ্বালানি নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়ে যায় — এটি জ্বালানি খাতে "সরবরাহ-কেন্দ্রীকরণ ঝুঁকি"-র একটি বাস্তব উদাহরণ।

আইনি লড়াই ও রাজনৈতিক জটিলতা
চুক্তি বাতিল বা পুনর্আলোচনার পথও মসৃণ নয়:

হাইকোর্ট চুক্তির বৈধতা পরীক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে এবং কমিটির পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে আদানির সালিশি প্রক্রিয়া স্থগিত রেখেছে।
<cite index="3-1">আইনি উপদেষ্টারা সতর্ক করেছেন, দুর্নীতির অভিযোগ তুলেও যদি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ গ্রহণ চালিয়ে যায়, তাহলে তা "জুডিশিয়াল এস্টোপেল" নীতির আওতায় ভবিষ্যতে চুক্তি বাতিলের দাবিকে দুর্বল করে দিতে পারে।</cite>
<cite index="3-1">ইংরেজি আইনের "ভয়েড অ্যাব ইনিশিও" নীতি অনুযায়ী দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে চুক্তিটি শুরু থেকেই অকার্যকর বলে গণ্য হতে পারে — তাই বিলম্ব না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিদেশি আইনি বিশেষজ্ঞরা।</cite>
অন্যদিকে, নতুন নির্বাচিত সরকার আদালতের বাইরে সরাসরি পুনর্আলোচনার পথ বেছে নিতে চাইছে, কারণ ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের স্পর্শকাতরতা একটি বড় বিবেচ্য বিষয়। এতে বোঝা যায়, শুধু আইনি বা প্রযুক্তিগত সমাধান নয়—ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

সামগ্রিক প্রভাব: বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ
আদানি চুক্তির প্রভাব বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে কয়েকটি স্তরে দেখা যাচ্ছে:

আর্থিক চাপ: PDB-র ক্রমবর্ধমান লোকসান সরকারি ভর্তুকির বোঝা বাড়াচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় বাজেট ও ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে।
কাঠামোগত অদক্ষতা: ব্যবহৃত না হওয়া সক্ষমতার জন্যও বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে — এটি শুধু আদানি নয়, "টেক-অর-পে" ধরনের একাধিক ক্যাপাসিটি চুক্তির সাধারণ সমস্যা।
সরবরাহ ঝুঁকি: বৈদেশিক মুদ্রা সংকটের সময় একক বৃহৎ সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরতা জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলে।
প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা: জরুরি আইনের আওতায় স্বচ্ছতাবিহীনভাবে সই হওয়া চুক্তিগুলো ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থানকে জটিল করে তুলছে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন: চুক্তি বাতিল বা কঠোর পুনর্আলোচনার সিদ্ধান্ত ভারতের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করতে পারে, যা এমনিতেই পটপরিবর্তনের পর সংবেদনশীল অবস্থায় আছে।

আদানি-বাংলাদেশ বিদ্যুৎ চুক্তি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে গত দশকে জরুরি ভিত্তিতে সই হওয়া একাধিক অসম চুক্তির প্রতিনিধিত্বমূলক উদাহরণ। সরকারি তদন্ত কমিটির নিজস্ব প্রতিবেদনই বলছে, স্বচ্ছতার অভাব, প্রতিযোগিতাহীন দরপ্রক্রিয়া এবং বিদেশি করের বোঝা স্থানান্তরের মতো শর্ত দেশের আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। সমস্যাটির প্রকৃত সমাধান নির্ভর করছে তিনটি বিষয়ের ওপর — আইনি প্রক্রিয়ার দ্রুততা, পুনর্আলোচনায় বাংলাদেশের দর-কষাকষির সক্ষমতা, এবং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এই তিনটির যেকোনো একটিতে দুর্বলতা থাকলে বিদ্যুৎ খাতের এই কাঠামোগত সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp