৮১ গম্বুজ নাকি ষাট গম্বুজ? খান জাহান আলীর তৈরি রহস্যময় শহরের ভেতরের গল্প

৮১ গম্বুজ নাকি ষাট গম্বুজ? খান জাহান আলীর তৈরি রহস্যময় শহরের ভেতরের গল্প
বাগেরহাটের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা প্রাচীন, রহস্যে মোড়া স্থাপত্য— ষাট গম্বুজ মসজিদ। নামটাই কেমন একটা ধাঁধার জন্ম দেয়। মসজিদের নাম যখন "ষাট গম্বুজ", তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয় এখানে ষাটটা গম্বুজ থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। এই মসজিদের গায়ে গুনে দেখলে গম্বুজের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮১টি। তাহলে নামের পেছনে কোন গল্প লুকিয়ে আছে? আর কে-ই বা এই বিশাল স্থাপত্যের রূপকার? চলুন, ইতিহাসের পাতা উল্টে জেনে নেওয়া যাক।

গম্বুজের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা

বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরসহ নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ষাটগম্বুজ মসজিদটিতে মোট ৮১টি গম্বুজ রয়েছে। সংখ্যাটা শুনে অনেকেই অবাক হন, কারণ নামের সঙ্গে বাস্তবতার এই ফারাক প্রথম দর্শনেই কৌতূহল জাগায়। তবে এই ৮১ সংখ্যার পেছনেও একটা হিসাব আছে। মসজিদের চার কোণে থাকা মিনার বা বুরুজের ওপর বসানো আছে চারটি গম্বুজ। এই চারটি বাদ দিলে বাকি থাকে ৭৭টি গম্বুজ। এই ৭৭টি গম্বুজ সাজানো আছে সারি সারি করে— অধিকাংশ বর্ণনায় বলা হয়েছে, ১১টি সারিতে মোট ৭৭টি গম্বুজ; এর মধ্যে মাঝের এক সারির ৭টি গম্বুজের উপরিভাগ চৌকোণা (চৌচালা), বাকি ৭০টি গোলাকার।

তাহলে "ষাট" নামটা এলো কোথা থেকে?

এখানেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য। মসজিদের ভেতরে গম্বুজের বদলে গোনা হয়েছিল স্তম্ভ বা খুঁটির সংখ্যা। জনশ্রুতি ও স্থাপত্য বর্ণনা বলছে, মসজিদের ছাদ দাঁড়িয়ে আছে ৬টি সারিতে ১০টি করে মোট ষাটটি পাথরের খুঁটির ওপর, আর সেই থেকেই মসজিদটির নাম হয়ে গেছে ষাটগম্বুজ মসজিদ। অর্থাৎ "ষাট" শব্দটা গম্বুজের সংখ্যা বোঝায় না, বরং বোঝায় সেই ষাটটি বিশাল থামকে, যেগুলোর ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে পুরো ছাদ। অনেকে অবশ্য একে রূপক অর্থেও ব্যাখ্যা করেন— নামটি শুনে যা মনে হয়, বাস্তবে ঠিক তা নয়; এটা আসলে একধরনের প্রতীকী নামকরণ।

এই বিশাল স্থাপত্যের নির্মাতা কে?

এই বিস্ময়কর মসজিদের নির্মাতা ছিলেন সুলতানি আমলের প্রখ্যাত সাধক ও শাসক খান জাহান আলী। ইতিহাসবিদদের মতে, তাঁর প্রকৃত নাম ছিল উলুঘ খান-ই-জাহান, যিনি পরবর্তীতে খানজাহান আলী (রহ.) নামেই বেশি পরিচিতি পান। পঞ্চদশ শতাব্দীতে তিনিই এই মসজিদ নির্মাণ করেন বলে ধারণা করা হয়; এটি ছিল বাংলাদেশের মধ্যযুগের সবচেয়ে বড় মসজিদ। তবে মসজিদ গাত্রে কোনো শিলালিপি না থাকায় নির্মাতা ও সাল বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত নয়; স্থাপত্যশৈলী ও প্রেক্ষিত থেকে খান জাহানের নির্মাণ বলে গবেষকরা মনে করেন। মসজিদ নির্মাণকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে চমৎকার একটি কিংবদন্তিও প্রচলিত আছে— বলা হয়, খানজাহান (রহ.) তাঁর অলৌকিক ক্ষমতাবলে মসজিদ নির্মাণের সব পাথর দূরবর্তী চট্টগ্রাম থেকে, মতান্তরে ভারতের উড়িষ্যার রাজমহল থেকে জলপথে ভাসিয়ে এনেছিলেন।

স্থাপত্যশৈলীর খুঁটিনাটি

মসজিদের গঠনশৈলীও কম চমকপ্রদ নয়। ভেতরে ৬০টি পাথরের স্তম্ভ ৬টি সারিতে ১০টি করে বিন্যস্ত; এই স্তম্ভ ও চারপাশের দেয়ালের ওপর গম্বুজগুলো বসানো। পশ্চিম দিকের কিবলা দেয়ালে নির্দিষ্ট দূরত্বে একাধিক অবতল মিহরাব রয়েছে (বিভিন্ন বর্ণনায় সংখ্যা ও বিন্যাসে ভিন্নতা দেখা যায়)। আকারের দিক থেকেও মসজিদটি বিশাল— উত্তর-দক্ষিণে বাইরের দিকে প্রায় ১৬০ ফুট ও ভিতরের দিকে প্রায় ১৪৩ ফুট লম্বা, পূর্ব-পশ্চিমে বাইরের দিকে প্রায় ১০৪ ফুট চওড়া। পুরো স্থাপনাটি ঘিরে রেখেছে প্রায় আট ফুট উঁচু একটি প্রাচীর।

বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি

এই মসজিদের গুরুত্ব শুধু স্থাপত্যেই সীমাবদ্ধ নয়, ইতিহাসেও এর স্থান অনন্য। বাগেরহাটের মসজিদ-শহরকে ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে (ষাটগম্বুজ এই শহরের অন্যতম প্রধান স্থাপনা)। আজও প্রতিদিন হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন এই স্থাপত্য দেখতে। স্থানীয় এক দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভাষায়, প্রায় ছয়শ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাকে সংরক্ষণ করা প্রত্যেকেরই দায়িত্ব, কারণ এই স্থাপত্যশৈলী বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে নতুন করে পরিচিত করেছে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, "ষাট গম্বুজ" নামটা আসলে একটা চমৎকার ভাষাগত রহস্য— নামের সঙ্গে বাস্তবতার মিল না থাকলেও, এর পেছনের গল্পটা ইতিহাস আর স্থাপত্যের এক অসাধারণ মেলবন্ধন। খান জাহান আলীর হাতে গড়া এই শহর আজও যেন কথা বলে সেই সুলতানি আমলের গৌরবময় দিনগুলোর।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp