এক নিঃসঙ্গ রাজনীতিকের কথা

এক নিঃসঙ্গ রাজনীতিকের কথা
বাংলা তথা উপমহাদেশের রাজনীতিতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর যে ভূমিকা, তা ইতিহাসের পাতায় বারবার আলোচিত হলেও তাঁকে নিয়ে যথাযথ মূল্যায়ন এখনও অনেকটাই অসম্পূর্ণ। এই লেখায় ফিরে দেখা যাক তাঁর রাজনৈতিক জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের কিছু কম আলোচিত দিক।

দিল্লি সম্মেলন ও পাকিস্তান প্রস্তাব
১৯৪৬ সালের ৭ এপ্রিল, ক্যাবিনেট মিশনের কাছে মুসলিম লীগের সুস্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরতে দিল্লিতে এক ঐতিহাসিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সেই সম্মেলনে পাকিস্তান প্রস্তাব ঘোষণার দায়িত্ব দেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে। সেই ভাষণে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন যে বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তান অর্জনের সংগ্রামে যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত। মজার বিষয় হলো, যেসব প্রদেশে মুসলমানরা সংখ্যালঘু ছিল, সেখান থেকেই তিনি সবচেয়ে বেশি উৎসাহ ও সমর্থন পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন—যা তাঁর মতে আন্দোলনকে নতুন গতি জুগিয়েছিল।

ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে এবং এর তাৎপর্য
ক্যাবিনেট মিশনের কার্যক্রমে তখন এমন আভাস পাওয়া যাচ্ছিল যে ব্রিটিশ সরকার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে তুলে দিয়ে বিদায় নেবে, আর মুসলিম লীগকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল না। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে জিন্নাহ ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট 'ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে' পালনের ডাক দেন, যার লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশদের কাছে মুসলিম লীগের দাবির প্রতি দৃঢ়তা প্রদর্শন করা। তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দী সেদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন, যা নিয়ে কংগ্রেস ও হিন্দু মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে।

কলকাতায় সেদিন ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়। তবে এই ঘটনার পরই ব্রিটিশ সরকার মুসলিম লীগের সঙ্গে গুরুত্ব সহকারে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। ইতিহাসবিদদের অনেকের মতে, বাংলায় সেদিন এই কর্মসূচি এভাবে পালিত না হলে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি বাস্তবায়ন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ত।

মন্ত্রিত্ব থেকে প্রধানমন্ত্রিত্ব
পরবর্তীতে সোহরাওয়ার্দী প্রথমে মন্ত্রী এবং পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনেন—চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেন এবং শিল্পায়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, পাকিস্তান আজও তাঁর প্রবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির ধারা অনেকাংশে অনুসরণ করে চলেছে।

রহস্যঘেরা মৃত্যু
১৯৬৩ সালে আরব সফরে থাকাকালীন ৫ ডিসেম্বর লেবাননের রাজধানী বৈরুতের একটি হোটেল কক্ষে রহস্যজনকভাবে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হয়। একাধিক ইতিহাসবেত্তা তাঁর মৃত্যুর পেছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন।

তাঁর মৃত্যুর পর আবুল মনসুর আহমদ মন্তব্য করেছিলেন যে এই আকস্মিক ক্ষতির গভীরতা বুঝতে জাতির বেশ কিছু সময় লেগেছিল। তাঁর ভাষায়, সোহরাওয়ার্দী বেঁচে থাকলে হয়তো আগরতলা ষড়যন্ত্রের মতো ঘটনা, যুদ্ধ কিংবা পরবর্তী রাজনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতি এড়ানো যেত। কবি ফররুখ আহমদও তাঁর মৃত্যুতে শোকগাথা রচনা করে তাঁকে "সিংহ-হৃদয় সংগ্রামী মহাপ্রাণ" বলে আখ্যায়িত করেন।

ব্যক্তিগত জীবন: প্রচারের আড়ালে এক নিঃসঙ্গ মানুষ
রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে সোহরাওয়ার্দীর ব্যক্তিগত জীবন ছিল বেশ জটিল ও বহুমাত্রিক। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে তিনি ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের সহকারী হিসেবে; পরবর্তীতে জীবনের শেষভাগে যুক্ত হন আওয়ামী লীগের সঙ্গে। তবে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সত্ত্বেও তাঁর কোনো প্রকৃত অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিল না বলে সমসাময়িকরা মনে করতেন। জীবনযাপনের ধরনে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ পাশ্চাত্য ঘরানার, অথচ রাজনীতি করতেন সাধারণ, প্রায়ই নিরক্ষর জনগণের মধ্যে—এই বৈপরীত্যই সম্ভবত তাঁর নিঃসঙ্গতার একটি কারণ ছিল।

তাঁর চরিত্রের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সাম্প্রদায়িকতামুক্ত মানসিকতা—তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন একজন হিন্দু গৃহভৃত্য। তিনি স্নেহভাজনদের প্রতি উদার ছিলেন, রাজনৈতিক আনুগত্যের হিসাব না কষেই সাহায্যের হাত বাড়াতেন। আবু জাফর শামসুদ্দিনের স্মৃতিকথায় উল্লেখিত ফরমুজুল হকের ঘটনা এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ—রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার পরও সোহরাওয়ার্দী তাঁকে আর্থিক সহায়তা দিতে দ্বিধা করেননি। এমনকি প্রয়াত সাংবাদিক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়াও তাঁর কাছ থেকে পাওয়া প্রাথমিক পুঁজি নিয়েই দৈনিক ইত্তেফাক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে জানা যায়।

দেশত্যাগের গ্লানি
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার (১৯৪৭) পরও সোহরাওয়ার্দী কলকাতাতেই থেকে যান। তবে তৎকালীন ভারত সরকার সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষবশত তাঁর কাছে সাতষট্টি লাখ টাকা আয়কর দাবি করে, তাঁর ব্যাংক হিসাব বাজেয়াপ্ত করা হয়, এমনকি তাঁর ব্যক্তিগত মোটরগাড়িও কেড়ে নেওয়া হয়। এভাবে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় ১৯৪৯ সালের মার্চে তিনি ভারত ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যেতে বাধ্য হন।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর জীবন ছিল বিরোধাভাসে ভরা—তিনি একদিকে ছিলেন আপসহীন রাজনৈতিক সংগ্রামী, অন্যদিকে ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন গভীর নিঃসঙ্গতার শিকার এক মানুষ। তাঁর প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও উদারতা আজও ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp