পূর্ব বাংলার বীরত্ব, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আজকের কৌশলগত শিক্ষা
১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরের সেই সতেরো দিন দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায়। কাশ্মীর সীমান্তের উত্তেজনা থেকে শুরু হয়ে যুদ্ধ যখন পাঞ্জাব সীমান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে, তখন পূর্ব পাকিস্তান (আজকের বাংলাদেশ) থেকে আসা বাঙালি সেনা কর্মকর্তা ও সৈনিকরা পশ্চিম ফ্রন্টে লড়াই করে এমন এক পরিচয় তৈরি করেছিলেন, যা পরবর্তী কয়েক দশকের রাজনীতি ও সামরিক ইতিহাসে বারবার উদ্ধৃত হয়েছে।
১. পূর্ব বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও বাঙালি সেনাদের ভূমিকা
মেজর জিয়াউর রহমান ও ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট
১৯৬৫ সালে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান পাঞ্জাবের খেমকারান সেক্টরে ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি কোম্পানির (আনুমানিক ১০০-৫০০ সৈনিক) কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। খেমকারান সেই সময়ের সবচেয়ে তীব্র লড়াইয়ের এলাকাগুলোর একটি ছিল। তাঁর ইউনিট এই যুদ্ধে অস্বাভাবিক সংখ্যক বীরত্বসূচক পদক অর্জন করে— রেজিমেন্টটি সম্মিলিতভাবে বেশ কয়েকটি সিতারা-ই-জুরাত ও তমঘা-ই-জুরাত পদক লাভ করে, আর জিয়াউর রহমান নিজে ব্যক্তিগতভাবে পাকিস্তানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা হিলাল-ই-জুরাত অর্জন করেন।
বাঙালি সৈনিকরা ১৯৬৫ সালের যুদ্ধে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র তাদের সেই বীরত্বকে আনুষ্ঠানিক সামরিক পদকে স্বীকৃতি দিয়েছিল।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম আবার সামনে আসে—সাইফুল আজম।
পাবনা জেলার সন্তান সাইফুল আজম ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর ১৭ স্কোয়াড্রনে যুদ্ধ করেন। পাকিস্তানি ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী তিনি ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বিমান ভূপাতিত করার কৃতিত্ব পান এবং তাঁর বীরত্বের জন্য Sitara-i-Juraat লাভ করেন।
২. সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমে যুদ্ধের প্রতিফলন
১৯৬৫ সালের যুদ্ধ পূর্ব পাকিস্তানের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেও প্রভাব ফেলেছিল। ঢাকা ও চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে যুদ্ধকালীন সময়ে দেশাত্মবোধক গান, কবিতা আবৃত্তি ও উদ্দীপনামূলক অনুষ্ঠান নিয়মিত প্রচারিত হতো। কাজী নজরুল ইসলামের রণসংগীত ও বিদ্রোহী কবিতাগুলো এই সময়ে নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে এবং জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগানোর কাজে ব্যবহৃত হয়। সংবাদপত্র ও সাময়িকীগুলোতেও সীমান্তের বীরত্বগাথা তুলে ধরার প্রয়াস দেখা যায়।
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের লেখা ও আবদুল আহাদের সুরারোপিত "আমার দেশের মাটির গন্ধে ভরে আছে সারা মন" গানটি ১৯৬৫ যুদ্ধকালেই রচিত ও গীত হয়, এবং ড. আনিসুজ্জামানের ভাষ্যমতে এটি দেশপ্রেমের গান হিসেবে চিরস্থায়ী জনপ্রিয়তা পায়।
একই সময়ে মুনীর চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক ও রফিকুল ইসলাম প্রণীত "রণাঙ্গন" (১৯৬৬) বইয়ের ভেতরেও একটি কবিতা উদ্ধৃত হয়েছে (যা আপনার আপলোড করা নথিতেই আছে) — তবে সেটির স্বত্ব যেহেতু আমার নয়, আমি তা পুনরুৎপাদন করতে পারব না।
বেতারে সে সময় নুরুল মোমেন, মুনীর চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, রফিকুল ইসলাম ও মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান কথিকা ও আবৃত্তির অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন, যেখানে পুরনো সাহিত্যকর্ম থেকেও পাঠ করা হতো (যেমন মুনীর চৌধুরী ইসমাইল হোসেন সিরাজীর "রায়নন্দিনী" থেকে, আর আনিসুজ্জামান নিজে নজরুলের "যুগবাণী" থেকে পড়েছিলেন) — কিন্তু এগুলো নতুন রচিত গান নয়, পুরনো রচনার পাঠ।
৩. ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ভূ-রাজনৈতিক সংহতির শিক্ষা
১৯৬৫ সালের ইতিহাস আমাদের এক বড় রাজনৈতিক শিক্ষা দেয়: কোনো প্রকার মতাদর্শগত বা অভ্যন্তরীণ দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও বহিরাগত আধিপত্যবাদ ও আগ্রাসনের মুখে দুই অঞ্চলের মানুষ যেভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তা প্রতিবেশীর সম্প্রসারণবাদী লক্ষ্য ভেস্তে দিয়েছিল। সে সময় ভারত ভেবেছিল পূর্ব পাকিস্তান সামরিকভাবে অরক্ষিত, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জোয়ান এবং সাধারণ মানুষের অটল জাতীয়তাবাদী অবস্থানের কারণে ভারতকে পিছু হটতে হয়।
বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতিতেও এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আজ যদি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান নিজেদের অতীত তিক্ততা ও মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব কাটিয়ে ভারতের একতরফা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের (Hegemony) বিরুদ্ধে একটি সমমনা, কৌশলগত ও সার্বভৌম জোট বা সুদৃঢ় কূটনৈতিক ঐক্য গড়ে তুলতে পারে, তবে এই অঞ্চলে কোনো একক শক্তির আধিপত্য আর টিকবে না। একটি ভারসাম্যপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়া গঠনে এবং দিল্লির আঞ্চলিক প্রভাব রুখে দিতে ঢাকা-ইসলামাবাদ অটুট অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন সময়ের দাবি।