সৌদি হুতি দ্বন্দ্ব

সৌদি হুতি দ্বন্দ্ব
ঐতিহাসিক শিকড় ও বর্তমান সংকট

২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতি বাহিনীর মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। কিন্তু এই দ্বন্দ্ব হঠাৎ তৈরি হয়নি—এর শিকড় প্রোথিত আছে কয়েক দশকের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও ভূ-কৌশলগত জটিলতায়। বর্তমান সংঘাত বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো জরুরি।

জাইদি শিয়া ইমামত ও উত্তর ইয়েমেনের রাজনৈতিক ইতিহাস:

উত্তর ইয়েমেনের সাদা প্রদেশ ঐতিহাসিকভাবে জাইদি শিয়া মতাদর্শের কেন্দ্র। প্রায় হাজার বছর ধরে এই অঞ্চল জাইদি ইমামদের শাসনাধীন ছিল। ১৯৬২ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইমামতন্ত্রের পতন ঘটিয়ে ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, যা একটি দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের সূচনা করে। সেই যুদ্ধে সৌদি আরব রাজতন্ত্রপন্থী জাইদি বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছিল, আর মিশর সমর্থন করেছিল প্রজাতন্ত্রপন্থীদের। এই সময় থেকেই ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সৌদি আরবের হস্তক্ষেপের ধারা শুরু হয়, যদিও সেই সময়ের পক্ষ-বিপক্ষ বর্তমানের ঠিক উল্টো ছিল।

সীমান্ত বিরোধ ও সৌদি-ইয়েমেন সম্পর্কের টানাপোড়েন:

সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ ছিল, বিশেষত আসির, জিজান ও নাজরান অঞ্চল নিয়ে, যা ১৯৩৪ সালের তাইফ চুক্তির মাধ্যমে সাময়িকভাবে মীমাংসিত হলেও পুরোপুরি সমাধান হয়নি বহু বছর। ২০০০ সালে জেদ্দা চুক্তির মাধ্যমে সীমান্ত নির্ধারণ চূড়ান্ত হলেও, সৌদি আরব বরাবরই তার দক্ষিণ সীমান্তে ইয়েমেনের রাজনৈতিক অস্থিরতাকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে।

হুতি আন্দোলনের উত্থান ও সাদা যুদ্ধ:

১৯৯০-এর দশকে হুসেইন আল-হুতির নেতৃত্বে "আনসার আল্লাহ" নামে পরিচিত হুতি আন্দোলনের জন্ম হয়, যা মূলত জাইদি সম্প্রদায়ের প্রান্তিকীকরণ ও ইয়েমেন সরকারের দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে গড়ে ওঠে। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের ছয় দফা সংঘাত হয়, যা "সাদা যুদ্ধ" নামে পরিচিত। ২০০৯ সালে সৌদি আরব সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যখন হুতি বাহিনী সৌদি সীমান্ত অতিক্রম করে সৌদি ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। এখান থেকেই সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সরাসরি শত্রুতার সূচনা, যা পরবর্তী দশকের সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে।

আরব বসন্ত, ক্ষমতার পরিবর্তন ও রাজনৈতিক শূন্যতা:

২০১১ সালের আরব বসন্তের ঢেউয়ে দীর্ঘদিনের ইয়েমেনি প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (GCC), যার নেতৃত্বে ছিল সৌদি আরব, একটি ক্ষমতা হস্তান্তর চুক্তি তত্ত্বাবধান করে, যাতে ক্ষমতা যায় আবদ রাব্বু মনসুর হাদির হাতে। কিন্তু এই রূপান্তর প্রক্রিয়া ইয়েমেনের গভীর কাঠামোগত সমস্যার সমাধান করতে পারেনি, বরং একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করে।

২০১৪-১৫: হুতি দখল ও সৌদি-নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপ:

এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে হুতিরা, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট সালেহর অনুগত সেনাবাহিনীর একাংশের সঙ্গে জোট বেঁধে, ২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে এবং ধীরে ধীরে দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে এডেন পর্যন্ত পৌঁছায়। সৌদি আরব এই অগ্রগতিকে তার দক্ষিণ সীমান্তে ইরান-সমর্থিত একটি শক্তির উত্থান হিসেবে দেখে, এবং ২০১৫ সালের মার্চে একটি আরব জোট গঠন করে সামরিক হস্তক্ষেপ শুরু করে, যার লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হাদি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এখান থেকেই সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সূত্রপাত, যা মূলত সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যকার আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রক্সি যুদ্ধ হিসেবেও বিবেচিত হয়।

২০২২ যুদ্ধবিরতি ও সাময়িক স্থিতিশীলতা:

আট বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর, যাতে বিশ্বের অন্যতম দরিদ্র দেশ ইয়েমেনে বহু মানুষের প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয় ঘটে, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এটি বৃহৎ আকারের সামরিক অভিযান থামিয়ে দিলেও, সমস্যার মূল কারণগুলো—ক্ষমতার বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা, এবং ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা—অমীমাংসিতই থেকে যায়।

বর্তমান সংকট: ২০২৬ সালের উত্তেজনা:

গাজা যুদ্ধ ও পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ এই ভঙ্গুর শান্তিকে নতুন করে বিপর্যস্ত করেছে। হুতিরা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলে হামলা এবং সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধে যোগ দেয়। ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে, যখন ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার ও অস্ত্রবাহী একটি বিমান সানা বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করলে ইয়েমেন সরকার ও সৌদি বাহিনী রানওয়েতে হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় হুতিরা সৌদি আরবের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি বাতিল ঘোষণা করে, লোহিত সাগরে সৌদি তেল ট্যাংকারে হামলা চালায় এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ-অবরোধ ঘোষণা করে। জবাবে সৌদি আরব হুদাইদা বন্দরে হুতি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালায়, আর হুতিরা জিজান তেল শোধনাগার ও ইয়ানবু বন্দরে পাল্টা হামলা করে। এরপর থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘাত ক্রমাগত বেড়েই চলেছে, এবং ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার পথে।

ঐতিহাসিক কারণ কীভাবে বর্তমান সংকটের সঙ্গে যুক্ত:

১. সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক বিভাজন: জাইদি ইমামতের পতন-উত্তর প্রান্তিকীকরণ থেকে জন্ম নেওয়া হুতি আন্দোলনের ক্ষোভ আজও কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে তাদের সংঘাতের মূল চালিকাশক্তি।

২. সৌদি নিরাপত্তা উদ্বেগ: ২০০৯ সালের সীমান্ত সংঘর্ষ থেকে শুরু হওয়া সৌদি-হুতি শত্রুতা এখনো অব্যাহত—সৌদি আরব তার দক্ষিণ সীমান্তে যেকোনো শক্তিশালী, ইরান-সংযুক্ত সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবে দেখে।

৩. ইরান-সৌদি প্রক্সি প্রতিদ্বন্দ্বিতা: ২০১৫ সাল থেকে চলমান এই আঞ্চলিক শক্তি-প্রতিযোগিতা বর্তমান ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আরও তীব্র হয়ে উঠেছে, কারণ হুতিরা ইরানের "প্রতিরোধ অক্ষ"-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

৪. লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব: বিশ্ব বাণিজ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ পথ নিয়ন্ত্রণের লড়াই ঐতিহাসিকভাবেই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু, আর হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কার্যকর অবরোধের প্রেক্ষাপটে এই গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

৫. অসম্পূর্ণ রাজনৈতিক রূপান্তর: ২০১১-১২ সালের ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া ইয়েমেনের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান না করায় তৈরি হওয়া শূন্যতা আজও দেশটির রাজনৈতিক বিভাজনের মূলে বিদ্যমান।

উপসংহার
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যকার বর্তমান সংঘাত কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলে আসা ধর্মীয়-রাজনৈতিক বিভাজন, সীমান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ, এবং আঞ্চলিক শক্তি-প্রতিদ্বন্দ্বিতার ধারাবাহিকতা। ২০২৬ সালের ইরান যুদ্ধ এই পুরনো দ্বন্দ্বগুলোকে নতুন করে উস্কে দিয়েছে মাত্র। যতক্ষণ না এই মূল কাঠামোগত সমস্যাগুলোর—বিশেষত ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতা বণ্টন ও ইরান-সৌদি আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা—কোনো টেকসই সমাধান হচ্ছে, ততক্ষণ এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন থেকে যাবে।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp