আজ ১ সেপ্টেম্বর — বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, সংক্ষেপে বিএনপি-র ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী শক্তিকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে সংগঠিত করে গড়ে তোলেন এই দল। এর আগে ১৯৭৭ সালে তিনি নিজের শাসনকে বেসামরিক রূপ দিতে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন এবং জাগদল (জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল) নামে একটি রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করেছিলেন, যা পরে বিএনপির সঙ্গে একীভূত হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই উপলক্ষে দলটির রাজনৈতিক দর্শন এবং তার সবচেয়ে আলোচিত-বিতর্কিত সাংবিধানিক পদক্ষেপ — পঞ্চম সংশোধনী — নিয়ে যে বিতর্ক এতদিন ধরে চলছে, তা ফিরে দেখা প্রাসঙ্গিক।
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের তত্ত্ব ও জিয়াউর রহমান
জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন সম্মুখসারির যোদ্ধা, বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত এবং স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত একটি নাম। ক্ষমতায় আসার পর তিনি "বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ" নামে একটি রাজনৈতিক তত্ত্ব হাজির করেন, যার মূল বক্তব্য ছিল — বাংলাদেশের জাতিসত্তার পরিচয় কেবল ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদে সীমাবদ্ধ না রেখে ভূখণ্ড, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যসহ সামগ্রিক এক পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়ে তোলা। দলগঠনের পরপরই তিনি কর্মীদের রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই তত্ত্ব, দলীয় আদর্শ ও সাংগঠনিক কাঠামো সম্পর্কে শিক্ষিত করার উদ্যোগ নেন। বিএনপি-পন্থী ভাষ্যে এই তত্ত্বকে দেখা হয় বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী একটি রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে, যেখানে জিয়া নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করেন, সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং নির্বাচনভিত্তিক রাজনীতি পুনর্বহালের পথে এগোন।
পঞ্চম সংশোধনী: প্রেক্ষাপট ও পরিবর্তনসমূহ
১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়ে ৯ এপ্রিল পাস হওয়া পঞ্চম সংশোধনী ছিল বাংলাদেশের সংবিধানে জিয়া-আমলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমান এই সংশোধনী সংসদে উত্থাপন করেন। এর মাধ্যমে মূলত তিনটি বড় পরিবর্তন আসে:
সংবিধানের মূলনীতি থেকে "ধর্মনিরপেক্ষতা" বাদ দিয়ে প্রস্তাবনার শুরুতে "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" এবং সংবিধানের গোড়ায় "সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস" সংযোজন করা হয়।
মূলনীতিতে থাকা "সমাজতন্ত্র"-কে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করে বলা হয় — "সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র"।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে ১৯৭৯ সালের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত সামরিক শাসনামলে গৃহীত সমস্ত পদক্ষেপ ও অধ্যাদেশকে সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়া হয়।
যে যুক্তিতে এটিকে জনগণের বিশ্বাসের প্রতিফলন বলা হয়
১৯৭২ সালের সংবিধানে গৃহীত ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র নীতি তৎকালীন এক সংকীর্ণ রাজনৈতিক বলয়ের সিদ্ধান্ত ছিল, যা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এই যুক্তিতে, পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও বিশ্বাসের কথা যুক্ত করা এবং সমাজতন্ত্রের সংজ্ঞা বদলে অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের ধারণায় নিয়ে আসাকে দেখা হয় একটি সংশোধনমূলক পদক্ষেপ হিসেবে, যা জনগণের ধর্মীয় চেতনা ও বাস্তবতাকে অধিকতর প্রতিফলিত করেছিল। এই ভাষ্যে জিয়াউর রহমানকে দেখানো হয় এমন একজন নেতা হিসেবে যিনি রাষ্ট্রীয় আদর্শকে জনগণের ধর্মবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন, পাশাপাশি বহুদলীয় গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতা ও চার মূলনীতি সংবিধানে পুনর্বহাল করা হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং আংশিকভাবে বাতিল হয়েছে, বিশেষত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট বিধান নিয়ে। বর্তমানে সংবিধান সংস্কার নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নতুন করে আলোচনা-দ্বিমত চলছে। অর্থাৎ, ১৯৭২ সালের মূলনীতি বনাম পঞ্চম সংশোধনীর পরিবর্তন — এই বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখনও একটি জীবন্ত প্রশ্ন, যার চূড়ান্ত মীমাংসা রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর নির্ভরশীল।