ইশরাক,আসিফ,সাদিক ঢাকা দক্ষিণের নির্বাচনী সমীকরণ কোন দিকে?

ইশরাক,আসিফ,সাদিক ঢাকা দক্ষিণের নির্বাচনী সমীকরণ কোন দিকে?
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন: প্রার্থীদের প্রোফাইল ও প্রচারণার তুলনা

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজধানীর রাজনীতিতে এখন নতুন কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচন। দীর্ঘদিন প্রশাসকের অধীনে থাকা এই সিটি করপোরেশনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হওয়াকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। কে হবেন পরবর্তী মেয়র, কার প্রচারণার বার্তা কেমন—এসব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে।

নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচিত মেয়রদের সরিয়ে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। পরবর্তী সময়েও ডিএসসিসিসহ বিভিন্ন সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ অব্যাহত থাকে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত আয়োজন এবং প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ ঠেকাতে নীতিমালা প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

এই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই বিভিন্ন দল নিজেদের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা বা প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করতে শুরু করেছে।

দলভিত্তিক প্রার্থী:

১) বিএনপি: প্রার্থী নিয়ে অনিশ্চয়তা

বিএনপির অভ্যন্তরে ডিএসসিসির মেয়র প্রার্থী নিয়ে এখনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন ডিএসসিসি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি দলীয় মনোনয়ন পেলেই নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে জানিয়েছেন।

ইশরাক হোসেনের পাশাপাশি ডিএসসিসির প্রশাসক আব্দুস সালাম এবং বিএনপির নেতা হাবিব উন নবী খান সোহেলের নামও আলোচনায় রয়েছে। দুজনই দলীয় সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলে উল্লেখ করেছেন। বিএনপির দলীয় জরিপে ইশরাক হোসেনের অবস্থান নিয়ে নানা তথ্য প্রকাশিত হলেও এসব তথ্য দলীয়ভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়। তাই এগুলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ইশরাক হোসেনের অন্যতম রাজনৈতিক শক্তি তাঁর পারিবারিক পরিচয়। তিনি প্রয়াত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে। এই পরিচয়ের পাশাপাশি সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানও তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে।

২) জামায়াতে ইসলামী:

জামায়াতে ইসলামী ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি মো. আবু সাদিককে, যিনি সাদিক কায়েম নামে পরিচিত, প্রার্থী হিসেবে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে। এর আগে দলটির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ড. আবদুল মান্নান ও হাজী এনায়েত উল্লাহর নাম আলোচনায় ছিল।

ছাত্ররাজনীতি থেকে নগর রাজনীতিতে সাদিক কায়েমকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্তকে তরুণ নেতৃত্বকেন্দ্রিক কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডাকসুর ভিপি হিসেবে তাঁর পরিচিতি এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তাঁর প্রচারণার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে।

সাদিক কায়েম ইসলামী ছাত্রশিবিরের দায়িত্ব থেকেও সরে দাঁড়িয়েছেন বলে অনেক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে জামায়াতের সিদ্ধান্ত থাকলেও দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের বিষয়টি দলীয় প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

৩) জাতীয় নাগরিক পার্টি:

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী করেছে। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম পাঁচটি সিটি করপোরেশনের প্রার্থী ঘোষণার সময় তাঁর নাম ঘোষণা করেন।

আসিফ মাহমুদও ডিএসসিসি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর প্রাথমিক প্রচারণায় ঢাকার ঐতিহাসিক পরিচয় ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। নগর উন্নয়নের পাশাপাশি ঢাকাকে ইতিহাস ও সংস্কৃতিনির্ভর একটি আধুনিক শহর হিসেবে গড়ে তোলার বার্তা তাঁর প্রচারণায় দেখা যাচ্ছে।

৪) নীলা ইসরাফিল: স্বতন্ত্র প্রার্থী

এনসিপির সাবেক নেত্রী নীলা ইসরাফিল ডিএসসিসি মেয়র পদে স্বতন্ত্রভাবে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ার প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন।

তাঁর প্রচারণায় নাগরিক সেবা, নিরাপত্তা ও বাসযোগ্যতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা তাঁর প্রচারণা সম্পর্কে জনমতকে বিভক্ত করেছে।

৫) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ:

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ডিএসসিসি নির্বাচনে শেখ ফজলুল করীম মারুফকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তিনি দলটির কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক। দলটি জানিয়েছে, তারা কোনো জোটে না গিয়ে নিজেদের প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেবে।

প্রচারণার প্রধান থিম:

চূড়ান্ত লিখিত ইশতেহার প্রকাশ না হলেও প্রার্থীদের বক্তব্য থেকে তাঁদের প্রচারণার প্রাথমিক বার্তা বোঝা যাচ্ছে।

•আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া—এনসিপি: ঢাকার ঐতিহাসিক পরিচয়, নগর ঐতিহ্য এবং নতুন ধরনের নগর ব্যবস্থাপনার বার্তা।

•সাদিক কায়েম—জামায়াত: তরুণ নেতৃত্ব, ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব।

•নীলা ইসরাফিল—স্বতন্ত্র: পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, স্বচ্ছ ও বাসযোগ্য নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি; পাশাপাশি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান।

•ইশরাক হোসেন—বিএনপি: পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য, পূর্বপরিচিতি এবং দলীয় সাংগঠনিক শক্তির ওপর নির্ভরতার সম্ভাবনা।

•আব্দুস সালাম—বিএনপি: দলীয় সংগঠন, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং নগর পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সামনে আনার সম্ভাবনা।

মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমীকরণ

ডিএসসিসি নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনায় প্রধানত ইশরাক হোসেন, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও সাদিক কায়েমের নাম সামনে রয়েছে। তবে বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইশরাক হোসেনকে প্রার্থী ঘোষণা করেনি। অন্যদিকে এনসিপি আসিফ মাহমুদের নাম ঘোষণা করেছে এবং জামায়াতে ইসলামী সাদিক কায়েমকে প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করেছে।

ইশরাক হোসেনের শক্তির জায়গা তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়, সংসদীয় অবস্থান ও বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো। আসিফ মাহমুদের শক্তি হলো দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়া, তুলনামূলক আগাম প্রচারণা এবং জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক পরিচয়। সাদিক কায়েমের প্রধান শক্তি ডাকসুর ভিপি হিসেবে পরিচিতি এবং তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা।

এই তিনজনের মধ্যে কে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে থাকবেন, তা নির্ভর করবে বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা, জামায়াতের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া, নির্বাচনের সময়সূচি, জোটগত সমঝোতা এবং মাঠপর্যায়ের প্রচারণার ওপর।

এখনো যা অনিশ্চিত


ডিএসসিসি নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা হয়নি। বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থীও নির্ধারিত নয়। জামায়াতের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত থাকলেও দলীয় চূড়ান্ত অনুমোদন ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

নীলা ইসরাফিলের মতো স্বতন্ত্র প্রার্থীরা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবেন কি না, এবং অন্যান্য দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দেবেন কি না—এসব বিষয়ও নির্বাচনের চূড়ান্ত চিত্রে প্রভাব ফেলবে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হলেও এর সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী ইশরাক হোসেন, এনসিপির ঘোষিত প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং জামায়াতের প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা সাদিক কায়েমকে ঘিরে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রধান সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক প্রস্তুতি, পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় এবং তরুণ নেতৃত্ব—এই ভিন্ন শক্তিগুলো ডিএসসিসি নির্বাচনের প্রচারণাকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে নির্বাচনের তারিখ, বিএনপির চূড়ান্ত মনোনয়ন এবং দলগুলোর শেষ মুহূর্তের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রকৃত রূপ নির্ভর করবে।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp