ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ না যাওয়ার কারণ কী? কেন আমন্ত্রণ গ্রহণ করল না ঢাকা?

ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ না যাওয়ার কারণ কী? কেন আমন্ত্রণ গ্রহণ করল না ঢাকা?
ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশ গেল না কেন, আমন্ত্রণের ধরনই কি কারণ?

নয়াদিল্লিতে ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হলো ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ সম্প্রসারিত জোটের নেতারা একসঙ্গে বসলেও এই মঞ্চে দেখা মেলেনি বাংলাদেশের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তো দূরের কথা, সরকারের কোনো প্রতিনিধিই সম্মেলনে অংশ নেননি। প্রশ্ন উঠছে—হাতের কাছে থাকা একটা কূটনৈতিক সুযোগ বাংলাদেশ কেন হেলায় ফেলল?

আমন্ত্রণ ছিলো, কিন্তু কার নামে?

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির স্পষ্ট করেই বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নয়, বরং বিমসটেকের (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন) বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, যেহেতু বাংলাদেশ সরকারের কাউকে সরাসরি আমন্ত্রণই জানানো হয়নি, তাই এখানে প্রতিনিধি পাঠানোর প্রশ্নই আসে না।

এই আমন্ত্রণটি এসেছিল গত ১৪ জুলাই, ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি কূটনৈতিক পত্রের মাধ্যমে। ভারতের পক্ষ থেকে অবশ্য নিশ্চিত করা হয়েছে, বিমসটেক চেয়ার হিসেবে হলেও এই আমন্ত্রণের সঙ্গে ফেব্রুয়ারি থেকে ঝুলে থাকা একটি পৃথক দ্বিপক্ষীয় আমন্ত্রণের বিষয়ও যুক্ত ছিল।

প্রোটোকল নাকি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টানাপোড়েন:

তবে অনেকের মতে, আমন্ত্রণের ভাষা যতটা না বিষয়, তার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতি। দিল্লিতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়ার ঘটনায় ঢাকা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ভারত যদি শেখ হাসিনাকে সেখান থেকে রাজনৈতিক তৎপরতা চালানোর সুযোগ দেয়, তাহলে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা দিল্লি বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হয়ে ফ্লাইট বদলে দেশে ফিরে আসার একটি ঘটনাও দুই দেশের সম্পর্কে চাপ তৈরি করেছে বলে জানা যায়। ফলে অনেকেই মনে করছেন, বিমসটেক-বনাম-প্রধানমন্ত্রী পরিচয়ের বিতর্কটি আসলে একটি উপলক্ষ মাত্র; মূল কারণ সম্পর্কের বর্তমান তিক্ততা, যার মধ্যে তাড়াহুড়ো করে কোনো বহুপাক্ষিক মঞ্চে না গিয়ে বরং অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে দ্বিপক্ষীয় সফরের পথ বেছে নেওয়াকেই কৌশলগত অবস্থান হিসেবে দেখছে সরকার।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভিন্নতা

তবে বিষয়টি নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন একরকম নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ফরিদুল আলম মনে করেন, সম্মেলনে না যাওয়ায় বাংলাদেশের তেমন কোনো ক্ষতি নেই; বরং এই আমন্ত্রণের সুযোগে ভারত হয়তো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে সুবিধা নিতে চাইছিল। তাঁর মতে, ব্রিকসে অংশগ্রহণ এই মুহূর্তে খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নয়।

কিন্তু সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান একেবারে উল্টো কথা বলছেন। তাঁর মতে, একটি আন্তর্জাতিক জোটের সম্মেলন এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত অন্য দেশগুলোর কাছে ভুল বার্তা দিতে পারে—মনে হতে পারে বাংলাদেশ নিজেই আর সদস্যপদ নিয়ে আগ্রহী নয়, অথচ ২০২৩ সালেই বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্যপদের জন্য আবেদন করেছিল। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ সদস্য না হলে তার সম্ভাব্য সুবিধা মূলত চীনের পকেটেই যায়, আর ভারতের লাভও এখানে কম নয়—তাই ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন আমন্ত্রণ পাঠানো হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও উঠতে পারে।

হাতছাড়া কূটনৈতিক সুযোগ:

ব্রিকস এখন আর শুধু পাঁচ দেশের ছোট জোট নয়—মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া যুক্ত হওয়ার পর এটি বিশ্ব অর্থনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বাংলাদেশ ২০২১ সাল থেকে ব্রিকসের নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সদস্য হওয়ায় এই মঞ্চের সঙ্গে দেশটির একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আগে থেকেই আছে। যুক্তি দেওয়া হয়েছে, চীন-রাশিয়া-ভারতের মতো শক্তিগুলোর সঙ্গে একই মঞ্চে থাকার সুযোগ, রোহিঙ্গা সংকট বা জ্বালানি সহযোগিতার মতো ইস্যু তোলার সুযোগ, এমনকি বিমসটেককে আরও দৃশ্যমান করে তোলার সুযোগও এই সম্মেলনে ছিল—আমন্ত্রণের, সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির ব্যাখ্যা করেছিলেন, অর্থনৈতিক অবস্থান ও প্রস্তুতির ঘাটতির কারণেই বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছিল, শুধু আবেদন জমা দেওয়া ছাড়া কূটনৈতিক তৎপরতাও যথেষ্ট ছিল না।

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অনুপস্থিতির পেছনে একটিমাত্র কারণ নেই। সরকারি ব্যাখ্যায় বিষয়টি আমন্ত্রণের প্রকৃত প্রেক্ষাপট বলছে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতি, শেখ হাসিনাকে ঘিরে অসন্তোষ এবং কূটনৈতিক আস্থার ঘাটতি। বিশ্লেষকদের একাংশ এতে ঝুঁকি দেখছেন না, আবার অন্য অংশ মনে করছেন এটি একটি সুযোগ হারানোর গল্প। বাংলাদেশ এখন বহুপাক্ষিক মঞ্চের বদলে দ্বিপক্ষীয় সফরের পথ বেছে নিয়েছে—এই কৌশল শেষ পর্যন্ত কতটা কাজে দেয়, তা বোঝা যাবে সামনের দিনগুলোতেই।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp