হুথিরা কি ইয়েমেনে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে?

হুথিরা কি ইয়েমেনে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে?
গত এক সপ্তাহে ইয়েমেন যুদ্ধের মানচিত্রটা রীতিমতো পাল্টে গেছে। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের পুরো উপকূল দখল করে ফেলেছে, আর তাদের যোদ্ধারা এখন বাব আল-মান্দেব প্রণালির একদম দোরগোড়ায়। প্রশ্নটা তাই আর "হুথিরা কতটা এগোতে পারল" নয়—এখন প্রশ্ন হলো, এই অর্জন তারা কতদিন ধরে রাখতে পারবে।

মোখার পতন যেভাবে সব বদলে দিল

গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বন্দরনগরী মোখা দখল করে নেয় হুথিরা, আর এটাকেই এই যুদ্ধের একটা টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। প্রতিরক্ষা নীতি বিশ্লেষক উলফগ্যাং পুশতাই আল জাজিরাকে বলেছেন, এর ফলে দক্ষিণ ইয়েমেনে সরকারি বাহিনীর কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ার একটা বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

মজার বিষয় হলো, হুথিরা একা লড়াই করে এই জয় পায়নি—বরং সরকারপন্থী তারেক সালেহর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেস হঠাৎ নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যাওয়ায় হুথিদের পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। এই প্রত্যাহার আসলে পুনর্গঠনের কৌশল ছিল, নাকি সামরিক চাপের কারণে বাধ্য হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত—সেটা এখনো পরিষ্কার নয়। মোখা পতনের পর হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে লাহেজ ও এডেনের দিকে ছুটছেন।

মোখা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তার একটা সহজ ভৌগোলিক কারণ আছে—শহরটি বাব আল-মান্দেব প্রণালি থেকে মাত্র ৭৫ কিলোমিটার দূরে। এই দখলের ফলে হুথিরা কার্যত ওই প্রণালির উপর প্রায় একচেটিয়া প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়ে গেছে, পাশাপাশি সরকারপন্থী বাহিনীর সরবরাহ লাইনও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

সংখ্যায় হুথিরা পিছিয়ে, তবু এগিয়ে কেন

সরাসরি সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে হুথিরা আসলে ছোট পক্ষ। ইয়েমেন সরকারের বাহিনীতে সদস্যসংখ্যা প্রায় তিন লাখ, আর হুথিদের প্রায় আড়াই লাখ। তারপরও হুথিরা এত দ্রুত এগিয়ে যেতে পারল কেন?

দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরির পর্যবেক্ষণ হলো, বর্তমান হুথি বাহিনী প্রায় এক দশক আগে সৌদি জোটের মুখোমুখি হওয়া হুথিদের চেয়ে সামরিকভাবে অনেক বেশি পরিণত—গত কয়েক বছরে ইরান থেকে পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন আর বিমান প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তাদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ একটু ভিন্ন কোণ থেকে বিষয়টা দেখছেন। তার মতে, হুথিদের এই সাফল্য শুধু তাদের নিজস্ব শক্তির প্রমাণ নয়, বরং সৌদি-সমর্থিত জোটের সক্ষমতা নিয়ে আগে যে ধারণা করা হয়েছিল, সেটাই বাস্তবে ভুল প্রমাণিত হয়েছে। তবে ক্রিগ এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন—হুথিদের আসল দুর্বলতা যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, শাসনক্ষমতায়। দ্রুত এলাকা দখল করা এক কথা, আর দীর্ঘমেয়াদে সেই এলাকা শাসন করা, অবরোধ কার্যকর রাখা—সেটা সম্পূর্ণ আলাদা চ্যালেঞ্জ।

পুরো নিয়ন্ত্রণ না নিয়েও নৌপথ অচল করে দেওয়া সম্ভব

এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা দরকার—হুথিদের আসলে বাব আল-মান্দেব বা গোটা লোহিত সাগরের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দরকারও নেই। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলাম সালেহর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নৌপথটি বিপজ্জনক—এমন একটা ধারণাই যথেষ্ট শিপিং কোম্পানি ও বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওই পথ এড়িয়ে চলতে বাধ্য করার জন্য। অর্থাৎ, প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ না করেও সেটাকে বাণিজ্যিকভাবে অকার্যকর করে দেওয়া সম্ভব—আর সেই কাজটা হুথিরা ইতিমধ্যে অনেকটাই করে ফেলেছে।

এর প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ছে সৌদি আরবের ওপর। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব তার ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের সক্ষমতা বাড়িয়ে দৈনিক ৭০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল লোহিত সাগর উপকূলে পাঠাচ্ছিল। কিন্তু এখন গোটা উপকূলই হুথিদের হাতে চলে যাওয়ায় এই বিকল্প রুটও ঝুঁকির মুখে। ইতিমধ্যে পাইপলাইনের একটি অংশে ধোঁয়া ওঠার ছবি সামনে এসেছে, যদিও হামলা হয়েছে কি না তা সৌদি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেনি।

সৌদি আরব কি একা থামাতে পারবে?

সৌদি বাহিনী গত ২৪ ঘণ্টায় মোখাসহ হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ব্যাপক বিমান হামলা চালালেও তা হুথিদের অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি। সরাসরি মার্কিন সহায়তার আশাও এখন পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি—সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান নিজে দুইবার ফোন করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন বিমান হামলার অনুরোধ জানালেও ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও আপাতত সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ কোনো পক্ষই ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের চলমান সংঘাত আরও বাড়াতে চাইছে না।

যুদ্ধের ছায়ায় ইরানের কৌশলগত জয়

এই পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী সম্ভবত ইরান। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইতিমধ্যেই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা তেহরান, এবার বাব আল-মান্দেবের ওপর হুথিদের প্রভাব বাড়লে দ্বিতীয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে পারবে বলে মনে করছেন অধ্যাপক আলাম সালেহ। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ আরও বাড়বে—জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ায় যুদ্ধ ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় হয়ে উঠছে, যা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

সব মিলিয়ে হুথিদের সামনে এখন দুটো ভিন্ন লড়াই। প্রথমটা সামরিক—এলাকা দখল করা, যেখানে তারা ইতিমধ্যে অনেকটাই সফল। দ্বিতীয়টা অনেক কঠিন—দখল করা এলাকা দীর্ঘমেয়াদে শাসন করা, অবরোধ কার্যকর রাখা, আর আন্তর্জাতিক চাপ সামলানো। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ বলছে, হুথিরা হয়তো পুরো লোহিত সাগর কখনোই "সম্পূর্ণ" বন্ধ করতে পারবে না, কিন্তু নৌপথটাকে যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি করার সক্ষমতা তাদের আছে। আর সেটাই আসলে এখনকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp