ঘরেও নয়, পথেও নয়- নারী আজ কোথায় নিরাপদ?

ঘরেও নয়, পথেও নয়- নারী আজ কোথায় নিরাপদ?
একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, কতটা মানবিক কিংবা কতটা উন্নত—তার অন্যতম বড় মানদণ্ড হলো সেই সমাজে নারীরা কতটা নিরাপদ। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের নানা গল্পের ভেতরেও আমাদের সমাজে নারীর নিরাপত্তা আজ গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘর থেকে কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে গণপরিবহন—প্রতিটি জায়গায় নারীরা যেন অদৃশ্য এক আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করেন। অথচ নারী কেবল একটি পরিচয় নয়; তিনি একজন মানুষ, একজন নাগরিক, একজন স্বপ্নবাহী সত্তা। সেই মানুষটিকেই আজ প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে বৈষম্য, অপমান ও সহিংসতার বিরুদ্ধে।

আমাদের সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য শুরু হয় জন্মের আগেই। এখনো বহু পরিবারে পুত্রসন্তানের আগমনে যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়, কন্যাসন্তানের জন্মে সেই আনন্দ দেখা যায় না। একটি মেয়েশিশু ছোটবেলা থেকেই বুঝতে শেখে—তার স্বাধীনতার পরিধি সীমিত, তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত, আর তার স্বপ্নের ওপর রয়েছে অসংখ্য শর্ত। ছেলেশিশুর জন্য যে সুযোগ, স্বাধীনতা ও উৎসাহ বরাদ্দ থাকে, মেয়েদের ক্ষেত্রে তা অনেকাংশেই অনুপস্থিত। এই বৈষম্যমূলক মানসিকতা ধীরে ধীরে সমাজের গভীরে এমনভাবে গেঁথে যায় যে, নারীর প্রতি অন্যায়কে অনেকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেন।

সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, নারীরা অনেক সময় বাইরের মানুষের চেয়ে নিজের পরিবারের ভেতরেই বেশি অনিরাপদ হয়ে পড়েন। স্বামী, বাবা কিংবা ভাইয়ের হাতেও অসংখ্য নারী মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯–এ আসা অভিযোগগুলোর একটি বড় অংশই পারিবারিক সহিংসতা নিয়ে—যার অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত স্বয়ং স্বামী। এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; এটি আমাদের সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। যে ঘর একজন নারীর আশ্রয় হওয়ার কথা, অনেক সময় সেটিই তার সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গায় পরিণত হয়।

নারীর প্রতি সহিংসতার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো “ভিকটিম ব্লেমিং” বা ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা। ধর্ষণ বা যৌন হয়রানির ঘটনার পর অপরাধীর শাস্তি নিয়ে যতটা আলোচনা হয়, তার চেয়ে বেশি প্রশ্ন তোলা হয় নারীর পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে। যেন অপরাধের জন্য অপরাধী নয়, বরং ভুক্তভোগীই দায়ী। ফলে একজন নির্যাতিত নারী কেবল শারীরিক বা মানসিক আঘাতই বহন করেন না; তাকে সামাজিক অপমানের ভারও বহন করতে হয়। এই মনোভাব অপরাধীদের পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে এবং নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও কঠিন করে তোলে।

সমস্যার আরেকটি বড় দিক হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি কিংবা পারিবারিক সহিংসতার বহু ঘটনাই প্রভাবশালী মহলের চাপ, সামাজিক ভয় কিংবা দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে ধামাচাপা পড়ে যায়। অনেক পরিবার সামাজিক সম্মানের ভয়ে অভিযোগ করতেও সাহস পায় না। ফলে অপরাধীরা বুঝে যায়—এই সমাজে অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। আর এই নীরবতাই সহিংসতার আগুনকে আরও ছড়িয়ে দেয়।

তবে এই সংকট কেবল আইন দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক ও মানসিক পরিবর্তনের। পরিবার থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে—নারী কোনো দুর্বল সত্তা নয়; তিনি সমান মর্যাদাসম্পন্ন একজন মানুষ। ছেলেমেয়ে উভয়কেই সমান সুযোগ, সমান সম্মান ও সমান স্বাধীনতার চর্চায় বড় করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিঙ্গসমতা ও মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্র, গণপরিবহন ও সামাজিক পরিসরে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

আইনের কঠোর প্রয়োগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা বিবেচনা না করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ নারী নির্যাতনের সাহস না পায়। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের সভ্য হয়ে ওঠে, যখন তার নারীরা ভয় নয়—স্বপ্ন নিয়ে পথ চলতে পারে।

আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো মেয়ে সন্ধ্যার পর রাস্তায় হাঁটতে ভয় পাবে না; যেখানে কোনো নারী কর্মক্ষেত্রে হয়রানির শিকার হবে না; যেখানে কন্যাসন্তানের জন্মকে বোঝা নয়, আশীর্বাদ হিসেবে দেখা হবে। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার কেবল স্লোগানে নয়—বাস্তব জীবনেও নিশ্চিত হবে।

ফাহিমা আক্তার
শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp