ঈদ ইসলামের অন্যতম প্রধান উৎসব, যেখানে সাম্যের বাণী উচ্চারিত হয়। কিন্তু বাস্তবতা কি তাই বলে? ঈদ এলেই আমাদের সমাজের শ্রেণীবৈষম্য সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। একদিকে কেউ ঈদের নতুন জামা কেনার সামান্য সাধ্যও রাখে না, অন্যদিকে কেউ লাখ টাকার পোশাক, বিদেশ ভ্রমণ ও বিলাসী ভোজনে মত্ত থাকে। গরিবের ঈদ মানে একবেলা ভালো খাবারের স্বপ্ন, আর বড়লোকের ঈদ মানে বিলাসিতার নতুন সংযোজন।
একটি গরিব পরিবারের কাছে ঈদের আগের দিন মানে একরাশ দুশ্চিন্তা- এক কেজি সেমাই, সামান্য একটু মাংস, আর বাচ্চাদের নতুন জামার ব্যবস্থা করা যাবে তো? ঈদের বাজার করতে গিয়ে যখন দাম শুনে হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়, তখন তাদের ঈদ কেমন আনন্দের হতে পারে? অথচ বড়লোকের বেলায় ভিন্ন। তাদের বাচ্চারা হাজার হাজার টাকার পোশাক কেনার বায়না ধরে, আবার বিদেশি খাবারের মেনু ঠিক হয় আগেভাগেই, কেউ কেউ তো ঈদের ছুটি কাটাতে দেশের বাইরেও চলে যান।
সবচেয়ে দুর্বিষহ অবস্থা হয় শ্রমজীবি মানুষের। যেমন একটি গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের কথা ভাবুন। ঈদের দিন তার সন্তানের জন্য নতুন জামা কেনার সামর্থ্য নেই, অথচ সে যে পোশাক তৈরি করে, তা পরেই কেউ কেউ পাঁচতারা হোটেলে ঈদের দাওয়াত উপভোগ করে। শ্রমিক বোনাস দূরে থাক, মাসের বেতন পায় কি না, তা নিয়েই সংশয়ে থাকে। অন্যদিকে, সেই কারখানার মালিক হয়তো কানাডার কোনো শপিং মলে পরিবারের ঈদ কেনাকাটা সারছেন। এইসব চিত্র কি আমাদের একটুও ব্যথিত করে না?
কথায় বলে, বড়লোকের ঈদ প্রতিদিন, গরিবের ঈদ একদিনও নয়। একজন মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত বাবা-মায়ের কাছে ঈদ মানে নিজের অর্ধেক খরচ বাঁচিয়ে সন্তানদের জন্য নতুন জামা-কাপড় কেনা। এক কেজি গরুর মাংস আর কিছু সেমাই যেন তাদের ঈদের পরম সুখ। অথচ বড়লোকদের বাড়িতে খাবারের বাহুল্য এত বেশি যে এক টেবিলের খাবার আরেক টেবিলে পৌঁছানোর আগেই উচ্ছিষ্ট হয়ে যায়।
রাজনীতিবিদদের ঈদের চিত্র আরেকটু ভিন্ন। তারা ১০ টাকার কিছু বান্ডিল হাতে নিয়ে বের হন, কিছু গরিব মানুষের হাতে গুঁজে দিয়ে ছবি তোলেন। এই ছবি পরদিন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়-” গরিবের বন্ধু” বলে প্রশংসা কুড়ান। কিন্তু এই সাময়িক দান-দক্ষিণা কি আসলেই গরিব মানুষের কষ্ট লাঘব করে? ঈদের এক দিনের জন্য কিছু টাকা পেলেও, পরদিন থেকেই তারা আবার অনাহারে দিন কাটায়।
এই শ্রেণিবৈষম্য কি ঈদের প্রকৃত শিক্ষা? ইসলাম যেখানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাইকে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ পড়ার শিক্ষা দেয়, সেখানে বাস্তবে ধনী ও গরিবের ঈদ উদযাপনের মধ্যে এত বড় ব্যবধান কেন? ঈদের প্রকৃত শিক্ষা হলো সাম্য, সহমর্মিতা, একে অপরের পাশে বঞ্চনার প্রতীক।
আমাদের এই বাস্তবতা বদলাতে হবে। ঈদ মানে কেবল নিজের জন্য আনন্দ নয়, বরং আশপাশের গরিব-অসহায় মানুষদের মুখে হাসি ফোটানো। ঈদের আগে আমাদের আশেপাশের দরিদ্র প্রতিবেশীদের খোঁজ নেওয়া দরকার- তারা কি ঈদের বাজার করেছে? তাদের ঘরে একটু ভালো খাবার রান্নার ব্যবস্থা আছে? ছোট শিশুগুলোর নতুন জামার স্বপ্ন কি পূরণ হয়েছে?
এই বৈষম্য দূর করতে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন প্রয়োজন। ঈদ ধনীদের বিলাসিতার নয়, বরং সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সমান আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার উৎসব। আসুন, ঈদের আগে একবার অন্তত আমাদের আশেপাশের গরিব মানুষের খোঁজ নেই। কেউ যেন ঈদের দিন অনাহারে না থাকে, নতুন জামার অভাবে যেন ছোট্ট কোনো শিশু কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে না পড়ে। ঈদের প্রকৃত আনন্দ কেবল নিজের জন্য নয়, অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর মাঝেই নিহিত।
ফাহিমা আক্তার
দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা