জাতিসংঘহীন এক পৃথিবী

জাতিসংঘহীন এক পৃথিবী
কী হতো যদি হঠাৎ বিলুপ্ত হয়ে যেত বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংস্থাটি?

কল্পনা করুন, এক সকালে ঘুম থেকে উঠে জানতে পারলেন—আট দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা জাতিসংঘ (UN) আর নেই। নিউইয়র্কের সদর দপ্তর খালি, জেনেভার কার্যালয় বন্ধ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান শান্তিরক্ষা মিশন স্থগিত, আর আন্তর্জাতিক কূটনীতির সবচেয়ে বড় মঞ্চটি ইতিহাসের পাতায় পরিণত হয়েছে।

এটি নিছক কল্পনা হলেও প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ—জাতিসংঘ যদি সত্যিই বিলুপ্ত হয়ে যায়, পৃথিবী কি আরও নিরাপদ হবে, নাকি আরও অস্থিতিশীল?

বাস্তবতা হলো, জাতিসংঘকে ঘিরে সমালোচনার অভাব নেই। রুয়ান্ডা ও বসনিয়ার গণহত্যা ঠেকাতে ব্যর্থতা, গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘ অচলাবস্থা, দারফুরের মানবিক বিপর্যয় কিংবা নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার—এসব কারণে বহুদিন ধরেই সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সমালোচকদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদ অনেক ক্ষেত্রে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভূরাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

তবুও, আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও সাবেক কূটনীতিকরা সতর্ক করেছেন—জাতিসংঘের বিকল্পহীনতা বোঝা যাবে ঠিক তখনই, যখন এটি আর থাকবে না।

১. নতুন আন্তর্জাতিক কাঠামো তৈরির চাপ

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রিফিউজি স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক এবং ইউএনএইচসিআরের সাবেক কর্মকর্তা জেফ ক্রিসপের মতে, জাতিসংঘ বিলুপ্ত হলে বিশ্বনেতাদের দ্রুত একটি নতুন বহুপক্ষীয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কারণ শরণার্থী সংকট, দুর্ভিক্ষ কিংবা মানবিক বিপর্যয়ের মতো সমস্যার সমাধান কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়।

আজ বিশ্বের কোটি কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষের খাদ্য, আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের ওপর নির্ভরশীল। সেই সমন্বয় ভেঙে গেলে ধনী দেশগুলোর জন্য মানবিক দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়া আরও সহজ হয়ে যাবে।

২. আন্তর্জাতিক আইনের প্রভাব কমে যাবে

জাতিসংঘ না থাকলেও আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হবে না। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) কাজ চালিয়ে যেতে পারে।

কিন্তু বাস্তবে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা অনেকাংশে রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ছাতার বাইরে তাদের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

ফলে বিশ্বরাজনীতি আরও বেশি সামরিক শক্তি, দ্বিপক্ষীয় চুক্তি এবং প্রভাব-রাজনীতিনির্ভর হয়ে উঠতে পারে। এর সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলো।

৩. বৈশ্বিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধাক্কা খাবে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দুর্বল হয়ে পড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো।

অনেক দেশের নিজস্বভাবে ওষুধের মান যাচাই, রোগ পর্যবেক্ষণ বা মহামারি মোকাবিলার সক্ষমতা সীমিত। WHO-এর কারিগরি সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় না থাকলে নিম্নমানের ওষুধের ঝুঁকি বাড়বে, নতুন সংক্রামক রোগ শনাক্ত করতে দেরি হবে এবং ভবিষ্যতের মহামারিগুলো আরও দ্রুত ও বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

৪. থমকে যেতে পারে বৈশ্বিক সংযোগব্যবস্থা

অনেকেই মনে করেন, জাতিসংঘ মানেই শুধু নিরাপত্তা পরিষদ। কিন্তু বাস্তবে এটি বিশ্বব্যবস্থার এক বিশাল প্রশাসনিক অবকাঠামোর অংশ।

আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিয়ম, ডাকব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগের মান, স্যাটেলাইট ফ্রিকোয়েন্সি সমন্বয়সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করে।

এই সমন্বয় হঠাৎ ভেঙে পড়লে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

৫. মানবিক সহায়তা হবে আরও খণ্ডিত

জাতিসংঘের সহায়তা কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে। অনেকের মতে, এতে উন্নত বিশ্বের প্রভাব তুলনামূলক বেশি।

জাতিসংঘ না থাকলে স্থানীয় এনজিও, আঞ্চলিক জোট বা বেসরকারি দাতব্য সংস্থা সেই শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করতে পারে। এতে সহায়তা ব্যবস্থায় কিছু বৈচিত্র্য এলেও তা হবে কম সমন্বিত, অনিশ্চিত এবং অঞ্চলভেদে অসম।

একই সঙ্গে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমও বহুপক্ষীয় কাঠামোর পরিবর্তে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একতরফা সামরিক হস্তক্ষেপের দিকে ঝুঁকতে পারে।

জাতিসংঘ নিখুঁত নয়। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা, শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার প্রতিফলন। ১৯৪৫ সালের পৃথিবী আর আজকের পৃথিবী এক নয়—তাই জাতিসংঘের সংস্কার নিয়ে বিতর্কও স্বাভাবিক।

কিন্তু সব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটি ত্রুটিপূর্ণ বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান প্রায়ই সম্পূর্ণ শূন্যতার চেয়ে বেশি কার্যকর। জাতিসংঘ হঠাৎ বিলুপ্ত হয়ে গেলে পৃথিবী হয়তো সঙ্গে সঙ্গে ধসে পড়বে না, তবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দুর্বল হবে, বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা আরও কঠিন হবে এবং ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের পথ আরও সংকুচিত হয়ে পড়বে।

প্রশ্নটি তাই কেবল "জাতিসংঘের প্রয়োজন আছে কি?"—এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, "বিশ্ব কি জাতিসংঘের চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প তৈরি করতে পেরেছে?" বর্তমান বাস্তবতায় সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp