হাজার বছর আগে যিনি আকাশ ছুঁয়েছিলেন
মানুষের আকাশে ওড়ার ইতিহাস বলতে আমরা সাধারণত রাইট ভাইদের নামই মনে করি। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, তাঁদের প্রায় এক হাজার বছর আগে মুসলিম স্পেনের এক বিজ্ঞানী নিজের তৈরি ডানা পরে পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তাঁর নাম আব্বাস ইবনে ফিরনাস।
এই লেখায় থাকছে তাঁর জীবন, তাঁর দুঃসাহসিক উড্ডয়ন-চেষ্টা এবং সেই ফ্লাইট শেষে ঘটে যাওয়া এক করুণ ভুলের কথা।
১) যে মানুষটি একইসঙ্গে ছিলেন চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও কবি
আব্বাস ইবনে ফিরনাসের জন্ম আনুমানিক ৮১০ খ্রিস্টাব্দে, আজকের স্পেনের আন্দালুস অঞ্চলে—বেশ কিছু সূত্র তাঁকে রোনদা অঞ্চলের বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেই সময়ের মুসলিম স্পেন ছিল জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। কর্ডোভা ও বাগদাদের দারুল হিকমাহর জ্ঞানচর্চার ধারার সঙ্গে তিনি শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক লেখায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
একজন মানুষের পক্ষে এতগুলো পরিচয় ধারণ করা বিরল। ফিরনাস ছিলেন প্রকৌশলী, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, পদার্থবিদ, কবি ও সুরকার। কিছু সূত্র তাঁকে চিকিৎসাবিদ্যায়ও পারদর্শী বলে উল্লেখ করেছে, যদিও এ দাবির পক্ষে প্রমাণ তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
উড্ডয়ন নিয়ে গবেষণার বাইরেও তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদানগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ক) তিনি একটি জলঘড়ি (Water Clock) তৈরি করেছিলেন, যার কথা আন্দালুসের ইতিহাসে উল্লেখ আছে। যদিও এর নাম "আল-মাকাতা" ছিল—এমন দাবি সব সূত্রে পাওয়া যায় না।
খ) বালি ও স্ফটিক গলিয়ে স্বচ্ছ কাচ তৈরির প্রযুক্তির উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। আন্দালুসে অপটিক্যাল কাচ ও দৃষ্টি সংশোধনকারী লেন্স ব্যবহারের পথিকৃৎদের একজন হিসেবেও তাঁকে বিবেচনা করা হয়।
গ) তিনি নিজের বাড়িতে একটি কক্ষকে গ্রহ-নক্ষত্রের ঘূর্ণায়মান মডেল দিয়ে সাজিয়েছিলেন, যেখানে কৃত্রিমভাবে মেঘ, বজ্রপাত এবং আলোর ঝলকানির প্রদর্শন করা হতো বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
২) এক ব্যর্থ চেষ্টা যা তাঁকে বদলে দিয়েছিল
৮৫২ সালের একটি ঘটনা আব্বাস ইবনে ফিরনাসের মনে গভীর ছাপ ফেলে। কর্ডোভার আরমেন ফিরমান (কিছু সূত্রে Armen Firman বা Ibn Firman) নামের এক ব্যক্তি রেশম ও পাখির পালক দিয়ে মোড়ানো কাঠের কাঠামো পরে একটি উঁচু মিনার থেকে ঝাঁপ দেন। তিনি উড়তে পারেননি, তবে ঢিলেঢালা পোশাকটি প্যারাসুটের মতো কাজ করায় প্রাণে বেঁচে যান। তবে এই ঘটনাটি মধ্যযুগীয় বিবরণে রূপকধর্মী ভাষায় এসেছে, তাই একে নিশ্চিত ঐতিহাসিক তথ্যের পরিবর্তে ঐতিহ্যগত বর্ণনা হিসেবেই দেখা হয়।
এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করে ফিরনাস উপলব্ধি করেছিলেন—শুধু সাহস দিয়ে আকাশ জয় করা যায় না; প্রয়োজন বাতাসের গতিবিধি এবং পাখির উড্ডয়ন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ।
৩) জাবাল আল আরুস থেকে সেই ঐতিহাসিক লাফ
পাখির ওড়া নিয়ে ফিরনাস বহু বছর গবেষণা করেন। বেশ কিছু লেখায় এই সময়কালকে প্রায় দুই দশক বলা হয়েছে, যদিও "২৩ বছর" বলে নির্দিষ্ট সংখ্যা সব গবেষণায় পাওয়া যায় না। অবশেষে ৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে, প্রায় ৬৫–৭০ বছর বয়সে, কাঠ, কাপড় এবং পাখির পালক দিয়ে তৈরি একটি গ্লাইডার নিয়ে তিনি প্রস্তুত হন।
কর্ডোভার কাছে রুসাফা এলাকার জাবাল আল আরুস পাহাড় থেকে তাঁর ঝাঁপ দেওয়ার বিবরণ বহু সূত্রে এসেছে। কেউ কেউ একে কর্ডোভার উপকণ্ঠের একটি পাহাড়ি ঢাল হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। হাজার হাজার মানুষ সেখানে উপস্থিত ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে নথিভুক্ত নয়। তবে এটি জনসমক্ষে প্রদর্শিত একটি উড্ডয়ন-চেষ্টা ছিল—এ বিষয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনাগুলো একমত।
ঝাঁপ দেওয়ার আগে তিনি উপস্থিত জনতাকে বলেছিলেন, সবকিছু ঠিক থাকলে তিনি আকাশ থেকে আবার একই স্থানে ফিরে আসতে চান। তবে এই বক্তব্যটি মূল আরবি সূত্রে সরাসরি উদ্ধৃত নয়; এটি পরবর্তী ব্যাখ্যামূলক লেখাগুলোতে বেশি দেখা যায়।
এরপর তিনি যন্ত্রটি শরীরে বেঁধে পাহাড়ের ঢাল থেকে শূন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। সমসাময়িক ও পরবর্তী ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, তিনি কিছু সময় বাতাসে ভেসে থাকতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং উল্লেখযোগ্য দূরত্ব অতিক্রম করেছিলেন। তবে ঠিক কতক্ষণ তিনি আকাশে ছিলেন, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ঐকমত্য নেই। কিছু লেখায় কয়েক মিনিট, আবার কোথাও প্রায় দশ মিনিটের কথা বলা হলেও এগুলো নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
সেই সময়ের এক কবি তাঁকে পালকে মোড়া অবস্থায় ফিনিক্স পাখির চেয়েও দ্রুতগতির বলে তুলনা করেছিলেন। তবে এটি ছিল একটি কাব্যিক উপমা, প্রযুক্তিগত বর্ণনা নয়।
৪) যে একটি ভুলের মাশুল দিতে হয়েছিল তাঁকে
কিন্তু গল্পের সবচেয়ে করুণ অধ্যায় শুরু হয় অবতরণের সময়।
দ্রুতগতিতে নিচে নামতে থাকা ফিরনাস তাঁর গতি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি এবং মাটিতে আঘাতপ্রাপ্ত হন। কিছু লেখায় তাঁর পিঠ ও কোমরে গুরুতর চোটের কথা বলা হয়েছে, আবার কিছু সূত্রে শুধু আহত হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। চোটের প্রকৃতি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ আছে।
পরে নিজের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে তিনি বুঝতে পারেন, নকশার একটি মৌলিক ত্রুটিই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।
পাখিরা অবতরণের সময় ডানার পাশাপাশি লেজ ব্যবহার করে ভারসাম্য রক্ষা করে এবং গতি কমায়। কিন্তু তাঁর গ্লাইডারের নকশায় এমন কোনো লেজ-সদৃশ স্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (Tail Unit) ছিল না। ডানা থাকলেও অবতরণের সময় গতি নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অংশের অভাবেই তাঁর অসাধারণ সাফল্য শেষ পর্যন্ত একটি বেদনাদায়ক দুর্ঘটনায় পরিণত হয়।
৫) শেষ জীবন এবং তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার
বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, আব্বাস ইবনে ফিরনাস প্রায় ৮৮৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। কিছু লেখায় ৮৮৭ সালকে তাঁর মৃত্যুসাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, আবার অন্য কিছু গবেষণায় সামান্য ভিন্ন তারিখের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তাই বিষয়টি নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতভেদ রয়েছে।
দুর্ঘটনার পর তিনি আর কোনো বড় উড্ডয়ন-চেষ্টা করেননি বলে ধারণা করা হয়।
তবে তাঁর কাজ বৃথা যায়নি। আধুনিক অনেক গবেষক মনে করেন, তাঁর গ্লাইডার-পরীক্ষা পরবর্তী উড্ডয়ন-চিন্তা ও অরনিথপটার (Ornithopter) নকশার ধারণাকে পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে থাকতে পারে, যদিও এ ধরনের সরাসরি প্রযুক্তিগত ধারাবাহিকতার প্রমাণ খুবই সীমিত।
তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন যে, নিয়ন্ত্রিত গ্লাইডিংয়ের মাধ্যমে মানুষের আকাশে ভেসে থাকার সম্ভাবনা বাস্তব হতে পারে। এ কারণেই আজ অনেক ঐতিহাসিক তাঁকে মানব ইতিহাসের প্রথম নথিভুক্ত নিয়ন্ত্রিত উড্ডয়ন-চেষ্টার অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আজও যেভাবে তাঁকে মনে রাখা হয়
চাঁদের দূরবর্তী পাশে অবস্থিত একটি খাদের নাম রাখা হয়েছে "Ibn Firnas Crater"। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়ন (IAU) ১৯৭৬ সালে এই নাম অনুমোদন করে।
ইরাকের বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে তাঁর একটি বিশাল ভাস্কর্য রয়েছে, যেখানে তাঁকে ডানা মেলে উড্ডয়নের মুহূর্তে চিত্রিত করা হয়েছে।
স্পেনের কর্ডোভায় গুয়াদালকিবির (Guadalquivir) নদীর ওপর ২০১১ সালে নির্মিত একটি সেতুর নাম রাখা হয়েছে Puente de Ibn Firnas বা ইবনে ফিরনাস ব্রিজ।
এছাড়া ২০১৩ সালে আবুধাবির একটি রোলস-রয়েস ডিলারশিপ তাদের Ghost মডেলের একটি সীমিত সংস্করণের নাম দেয় "Firnas Motif"। মাত্র পাঁচটি গাড়ির এই বেসপোক কালেকশনে তাঁর উড্ডয়নের প্রতীক ও ডানার নকশা ব্যবহার করা হয়েছিল। এটি রোলস-রয়েসের বৈশ্বিক কোনো মডেল ছিল না; বরং মধ্যপ্রাচ্যের জন্য তৈরি একটি বিশেষ সংস্করণ।
আব্বাস ইবনে ফিরনাস শুধু একজন উদ্ভাবক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি অসম্ভবকে সম্ভব করার সাহস দেখিয়েছিলেন। তাঁর গ্লাইডার হয়তো নিখুঁত ছিল না, কিন্তু সেই সাহসী পরীক্ষাই মানবজাতির উড্ডয়নের ইতিহাসে এক অমর অধ্যায় হয়ে আছে। রাইট ভাইদের বহু শতাব্দী আগে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন—আকাশকে স্পর্শ করার স্বপ্ন মানুষের বহু পুরোনো, আর সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিতে জ্ঞান, পর্যবেক্ষণ এবং সাহস—তিনটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।