জুলাই গ্রাফিতি ও ২০২৪ গণ-অভ্যুত্থানের ইশতেহার

জুলাই গ্রাফিতি ও ২০২৪ গণ-অভ্যুত্থানের ইশতেহার
দেয়ালে লেখা রক্তের ইতিহাস: জুলাই গ্রাফিতি ও এক গণজাগরণের ইশতেহার

রংতুলির আঁচড় যখন শাসক বা স্বৈরাচারের বুলেটের চেয়েও তীব্র ও ধারালো হয়ে ওঠে, তখন প্রাচীরগুলো আর কেবল ইট-সিমেন্টের দেয়াল থাকে না—তা হয়ে ওঠে মুক্তিকামী গণমানুষের জীবন্ত ইশতেহার। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের রাজপথ ও অলিগলির দেয়ালগুলো ঠিক এই রূপই পরিগ্রহ করেছিল।
জুলাইয়ের তীব্র দাবদাহ আর বুলেটের ক্ষতের মাঝেও তরুণদের আঁকা গ্রাফিতিগুলো ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক দ্রোহ।

জুলাই গ্রাফিতির প্রেক্ষাপট


একটি রাজপথের আন্দোলন যখন সশস্ত্র ও নির্মম দমনের মুখোমুখি হয়, তখন প্রতিবাদ কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রূপ নেয় দৃশ্যশিল্পে। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে পুলিশের গুলিতে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যু, আর তার পরবর্তী দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু, নারী, শ্রমিক ও ছাত্রদের ওপর চালানো নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্ম তাদের ক্ষোভ উগরে দিয়েছিল রঙ ও তুলিতে।

দেয়াল চিত্রায়ন বা 'স্ট্রিট আর্ট' বিশ্বের বিভিন্ন বিপ্লবে—যেমন ফরাসি বিপ্লবোত্তর রাজপথ, আরব বসন্ত কিংবা ল্যাটিন আমেরিকার মেঠো আন্দোলন—সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশে ২০২৪-এর জুলাইয়ে এর মাত্রা ছিল নজিরবিহীন। কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট এবং দমনপীড়নের রুদ্ধশ্বাস পরিবেশে যখন কণ্ঠ রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তখন দেয়ালের ক্যানভাস কথা বলে উঠেছিল।

ভাষা ও প্রতীকী মাত্রা: কী বলেছিল দেয়ালগুলো?

জুলাইয়ের গ্রাফিতিগুলোতে কেবল রাজনৈতিক ক্ষোভ ছিল না, বরং সেখানে ফুটে উঠেছিল এক অখণ্ড ইতিহাসের অবিনাশী চেতনা এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি।
দুই হাত প্রসারিত করে পুলিশের সামনে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আবু সাঈদের প্রতিকৃতিটি আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী আইকনে পরিণত হয়। এর পাশাপাশি ক্যালেন্ডারের গতানুগতিক হিসাব উল্টে দিয়ে '৩৬ জুলাই' লেখার মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ত্বরান্বিত না হওয়া পর্যন্ত জুলাই মাস যেন শেষই হচ্ছে না—এই বার্তা দিয়ে শাসকের সময় গণনাকেই একপ্রকার চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।

বিইউপি-র শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ আন্দোলনের সময় তৃষ্ণার্ত সহযোদ্ধাদের মাঝে পানি বিতরণ করতে করতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। তাঁর সেই আকুল আহ্বান—"পানি লাগবে কারো, পানি?"—দেয়ালে দেয়ালে চিত্রায়িত হয়েছিল মানবিকতা ও আত্মত্যাগের এক অবিনাশী প্রতীক হিসেবে। এর বাইরে ফ্যাসিবাদের মুখাকৃতি, বন্দি ডানাভাঙা পাখি এবং ক্ষমতাশ্রয়ী আমলাতন্ত্রকে ব্যঙ্গাত্মক রূপে ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল দেশের শত শত দেয়ালে।

১৯৬৯, ১৯৯০ ও ২০২৪: তিন অভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক যোগসূত্র

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস কোনো আকস্মিক রেখাচিত্র নয়; এটি স্বৈরাচারবিরোধী গণমানুষের অবিচ্ছিন্ন রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের ধারাবাহিকতা। ঐতিহাসিক বিচারে ২০২৪-এর জুলাই গ্রাফিতি কেবল তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ ছিল না, বরং তা ছিল অতীতের বিপ্লবগুলোর এক আধুনিক রূপায়ন।
১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান গড়ে উঠেছিল আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন এবং ৬ দফা ও ১১ দফা দাবিকে কেন্দ্র করে; শহীদ আসাদ ও মতিউরের রক্তের ওপর দাঁড়িয়েই খুলেছিল স্বাধীনতার প্রবেশদ্বার। এর প্রায় দুই দশক পর, ১৯৯০ সালের এরশাদ-বিরোধী স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামে শহীদ নূর হোসেনের পিঠে ও বুকে লেখা 'স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক' পরিণত হয়েছিল রাজপথের প্রথম 'জীবন্ত গ্রাফিতি'তে। আর ২০২৪ সালে এসে ফ্যাসিবাদের পতন, মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও বাকস্বাধীনতার দাবিতে দেয়ালচিত্র ও ভিজ্যুয়াল আর্ট হয়ে উঠেছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের ইশতেহার।

১৯৯০ সালে নূর হোসেন নিজের শরীরকে ক্যানভাস বানিয়ে যে বারোটি অক্ষর ফুটিয়ে তুলেছিলেন, ২০২৪-এর তরুণ প্রজন্ম ঠিক সেই কাজেরই প্রাতিষ্ঠানিক ও বিস্তৃত রূপ দিয়েছে সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে।

বিপ্লব-পরবর্তী বাস্তবতা

জুলাই-আগস্টের এই রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নতা রয়েছে। সরকারি গেজেট অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৮৩৪-এর বেশি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে তা ১,০০০-এর বেশি, জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (OHCHR) ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে এই সংখ্যা প্রায় ১,৪০০ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে, আর ছাত্র সংগঠন Students Against Discrimination-এর হিসাবে এটি ১,৫৮১ জন। আহতের সংখ্যা নিয়েও একই রকম পার্থক্য আছে—বিভিন্ন সূত্রে তা ১১ হাজার থেকে ২২ হাজারের বেশি পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী নিহতদের প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশ ছিল শিশু।

তবে বিপ্লবের এই গৌরবোজ্জ্বল অর্জনের পর আজ অন্তর্বর্তীকালীন ও নির্বাচিত সরকারের দীর্ঘ সময় পার হলেও, শহীদ পরিবার ও আহত 'জুলাই যোদ্ধাদের' পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন ও ডাটাবেজ তৈরির কাজ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ধীরগতির শিকার। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জুলাই ফাউন্ডেশন এ পর্যন্ত ৮২৯ জন শহীদের পরিবার এবং ৬,৮৬৫ জন আহত ব্যক্তিকে বিভিন্ন আর্থিক ও পুনর্বাসন সহায়তা দিয়েছে, যার সম্মিলিত পরিমাণ প্রায় ১১৪ কোটি টাকা। কিন্তু এখনও প্রায় সাড়ে আট হাজারের বেশি মানুষ—শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত যোদ্ধা মিলিয়ে—কোনো ধরনের সহায়তার আওতার বাইরে রয়ে গেছেন, যাদের অনেকেই আইনি জটিলতা, মেডিকেল সার্টিফিকেটের প্রশাসনিক লাল ফিতা এবং অর্থ সংকটের মুখোমুখি।

দেয়ালে আঁকা যে বীরেরা আজ আমাদের নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, রাজপথে তাঁদের অধিকার ও পুনর্বাসনের এই সংকট দূর করাই এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের প্রধান নৈতিক দায়িত্ব।


গ্রাফিতি থেকে অখণ্ড ইতিহাস


জুলাইয়ের গ্রাফিতিগুলো কেবল ক্ষণস্থায়ী কিছু রং-তুলির আঁচড় নয়; এগুলো একটি জাতির গণতান্ত্রিক বিবর্তনের অখণ্ড দলিল। ১৯৬৯, ১৯৯০ কিংবা ২০২৪—সময় ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও বুলেটের মুখে তরুণদের বুক পেতে দেওয়া এবং অন্যায়ের দেওয়ালে ক্ষোভের আখ্যান আঁকার সুর একই সুতোয় বাঁধা।

যদি রাষ্ট্র এই ইতিহাসকে কেবল আমলাতান্ত্রিক ফাইলের নিচে বন্দি করে রাখে, তবে তা কেবল সমকালীন যোদ্ধাদেরই অবমাননা করা হবে না, বরং ইতিহাসের অখণ্ডতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাবে। জুলাইয়ের এই চিত্রমালা এবং রাজপথের রক্তের ঋণ শোধ করার একমাত্র উপায় হলো—দেয়ালের সেই বার্তাগুলোকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের বাস্তব রূপ দেওয়া।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp