বিশ্বকে বুঝতে হলে শুধু রাজনীতি বা অর্থনীতি জানলেই হয় না; বুঝতে হয় ভূরাজনীতি। কারণ আধুনিক বিশ্বের প্রতিটি বড় শক্তির কর্মকাণ্ড ভূরাজনৈতিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকে। তারাও যুদ্ধ হয়, তারাও সামরিক লজিস্টিক গড়ে উঠচ্ছে, তারাও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়— সবকিছুর পেছনে রয়েছে শক্তির ভারসাম্য রক্ষা এবং বিশ্বকে অধিকতর এগিয়ে নেওয়া।
আজকের বিশ্বে একটি দেশের ক্ষমতা শুধু তার সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং তার ভৌগলিক অবস্থান, অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জ্বালানী সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর। এই সব বিষয় ও শক্তির বণ্টন-বিশ্লেষণই হল ভূরাজনীতি।
ভূরাজনীতির ধারণা
ভূরাজনীতি বা Geopolitics শব্দটি দুটি অংশ নিয়ে গঠিত— “Geo” অর্থ ভূগোল এবং “Politics” অর্থ রাজনীতি। অর্থাৎ, একটি দেশের ভূগোল কীভাবে তার রাজনীতি, সামরিক বাহিনী, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে, সেই বিষয়ই ভূরাজনীতির মূল বিষয়।
একটি দেশের অবস্থান যত সুবিধাজনক হয়, তাকে তার কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ে। যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানী সম্পদের কারণে হয়, তাকে তথা বিশ্ব শক্তিগুলোর আগ্রহ বাড়ে। আবার যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুটের কারণে হয়, তাকে বেশি আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ হয়।
ইতিহাসের পর্যায়ে দেখা যায়, বিশ্বের বড় বড় সাম্রাজ্যগুলো তাদের ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই শত্রুশিবিরে উঠেছে। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দুটি শক্তি ব্লক শাসন করছে। লাতিন আমেরিকার ইউনিয়ন থেকে ভূগোলগত সুবিধা এবং সামুদ্রিক শক্তির কারণে তথা রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখছে। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, রাশিয়া এবং ইরান তথা বিশ্বের প্রধান ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভূরাজনীতির প্রধান উপাদান
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সম্পর্কে জানা জরুরি।
১. ভৌগলিক অবস্থান
একটি দেশের অবস্থান তার কৌশলগত গুরুত্ব নির্ধারণ করে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বের জ্বালানী রাজনীতির কেন্দ্র। কারণ এই অঞ্চলে রয়েছে তথা বিশ্বের তেল। একইভাবে চীন সাগর তথা বিশ্বের বাণিজ্যিক জাহাজ এই রুট দিয়ে চলে করে।
২. প্রাকৃতিক সম্পদ
তেল, গ্যাস, কয়লা, খনিজ সম্পদ একটি দেশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ করে। উদাহরণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে আরব উপসাগরে তথা বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তথা বিশ্বের কারণ।
৩. সামরিক শক্তি
আধুনিক বিশ্ব সামরিক শক্তি এখন একটি বড় ফ্যাক্টর। সামরিক শক্তি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং উন্নত প্রযুক্তি একটি দেশকে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাবশালী করে। NATO তথা বিশ্বের সবকয়টি সামরিক জোট হিসেবে বিবেচিত।
৪. অর্থনৈতিক ক্ষমতা
বর্তমান অর্থনৈতিক শক্তি অকল্পনীয় সামরিক শক্তির চেয়েও বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে উঠছে। চীন সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে তথা বিশ্বের অবস্থান প্রভাবিত করছে। “Belt and Road Initiative” প্রকল্পের কারণে চীন এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপে তথা প্রভাব বাড়ায়।
৫. প্রযুক্তি ও তথ্য
বর্তমান যুগে প্রযুক্তিও একটি বড় ভূরাজনৈতিক অস্ত্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার সামরিক বাহিনী, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণ তথা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। প্রযুক্তিগত আধিপত্য তথা আমেরিকা ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে।
ঠান্ডা যুদ্ধ এবং নতুন বিশ্বব্যবস্থা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব দুটি ভাগে হয়— একদিকে আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পুঁজিবাদী ব্লক, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক। এই দুটি ব্লকের মধ্যে কোনো সরাসঙ্গত যুদ্ধ না হওয়া সত্ত্বেও অস্ত্র প্রতিযোগিতা, মহাকাশ প্রতিযোগিতা, গুপ্তচরবৃত্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার চলছে। Cold War তথা রাজনীতিকে কয়েক দশক ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা একক পরাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এর পরের বছর চীনের উত্থান এবং রাশিয়ার পুনরায় শক্তিশালী হওয়া তথা বহুপাক্ষিক বিশ্বের দিকে পরিচালিত করছে।
আমেরিকা বনাম চীন: নতুন ঠান্ডা যুদ্ধ?
বর্তমান পর্যায়ে সবকয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হচ্ছে আমেরিকা ও চীনের মধ্যে।
আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান শক্তি হিসেবে চীন দ্রুত অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে তার অবস্থানে চ্যালেঞ্জ করছে।
চীন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি। তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, 5G প্রযুক্তি, বাইওটেকনোলজি এবং মহাকাশ গবেষণায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আমেরিকা চীনের এই উত্থানকে তথা বিশ্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে। Huawei তথা যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তি যুদ্ধ এবং তাইওয়ান ইস্যু এই প্রতিযোগিতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তাইওয়ান সংকট
তাইওয়ান বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক অঞ্চল। চীন তাইওয়ানকে তথা দেশের অংশ হিসেবে করে, কিন্তু তাইওয়ান স্বাধীনভাবে শাসন করে। আমেরিকা তাইওয়ানকে সামরিক ও রাজনৈতিক সহায়তা দেয়। ফলে এই অঞ্চলে সংঘাত বাড়ছে এবং বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভূরাজনীতি
২০২২ সালে শুরু হওয়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়; এটি বৃহত্তর বিশ্বের শক্তির ভারসাম্য প্রভাবিত করছে।
রাশিয়া তথা দেশ, ইউক্রেনে যে অঞ্চল দখল করেছে সেটি তার কৌশলগত সুবিধার জন্য হুমকি হতে পারে। অন্যদিকে পশ্চিম বিশ্ব ইউক্রেনকে সহায়তা দিয়ে রাশিয়ার প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে।
এই যুদ্ধের ফলে—
• বিশ্বজুড়ে সংকট বাড়ছে
• জ্বালানীর দাম বাড়ছে
• ইউরোপের সামরিক সংকট বাড়ছে
• রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে
• বিশ্ব অর্থনীতি অস্থিতিশীল হচ্ছে
এই যুদ্ধ লেখকদের মতে তথা বিশ্ব একটি আঞ্চলিক সংকট বিশ্বকে প্রভাবিত করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি
মধ্যপ্রাচ্য বহুতন্ত্র বিশ্বের ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। কারণ এই অঞ্চলে রয়েছে বিশ্বের তেল ও গ্যাস সম্পদ।
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট
ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনের সংকট আধুনিক বিশ্বের অন্যতম রাজনৈতিক সংকটগুলোর একটি। এই সংকট শুধু আঞ্চলিক সীমান্ত সীমাবদ্ধ নয়; এর সবকয়টি আমেরিকা, ইরান, আরব বিশ্ব এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর স্বার্থ।
ইরান বনাম সৌদি আরব
ইরান এবং সৌদি আরবের মধ্যে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতাও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল বনাম ইরান সংকট
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের সবকয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক সংকট হচ্ছে ইসরায়েল বনাম ইরানের সম্পর্ক। ইরান তথা অঞ্চলে আধিপত্যবাদী শক্তি হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে ইসরায়েল তথা দেশ, ইসরায়েলের সামরিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা তার কৌশলগত সুবিধার জন্য হুমকি।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের সবকয়টি বড় শক্তি। আমেরিকা ইসরায়েলকে সামরিক, প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক সহায়তা দেয়। ফলে ইরান ও ইসরায়েলের সংকট অকল্পনীয় আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
সামরিক উপদস্থ
ইসরায়েলের সামরিক ক্ষমতা এই সংকটের কেন্দ্র। আমেরিকা ও ইসরায়েল তথা দেশ, ইরান লক্ষ্যবস্তু ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র। যদিও ইরান তেল উৎপাদনের জন্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কারণে হুমকি। এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের ওপর তীব্র আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে।
প্রতিটি যুদ্ধ
ইরান সরাসঙ্গত যুদ্ধের ক্ষতি মধ্যপ্রাচ্যের তথা বিশ্বের অবস্থান প্রভাবিত করছে। অন্যদিকে ইসরায়েল তথা বিশ্বের তথা সুবিধাজনক অবস্থান হাই চায়েকছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য বর্তমান একটি দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীল অঞ্চলে রূপ নিচ্ছে।
সিরিয়ার ভূতিকা
বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সিরিয়া একটি ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক অবস্থান নিতে চাচ্ছে। সিরিয়া একদিকে ইরানের প্রতিবশী ও প্রতিপক্ষ, অন্যদিকে সৌদি আরব ও পশ্চিম বিশ্বের সবকয়টি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এই কারণে সিরিয়া মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনা করতে কূটনৈতিক সংকটের কেন্দ্র অবস্থান নিচ্ছে।
ভারত-চীন প্রতিযোগিতা
এশিয়ার ভূরাজনীতি ভারত এবং চীনের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুটি দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘাত, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের চেয়ে রয়েছে।
ভারত বর্তমান আমেরিকার সবকয়টি কৌশলগত সম্পর্ক শক্তিশালী করছে, যা চীনকে উত্তেজিত করছে। একই সময় ভারত ঐতিহাসিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
২০২৫ সালের ভারত-সিরিয়া উত্তেজনা
২০২৫ সালে ভারত-সিরিয়া এর সম্পর্ক আবারও উত্তেজনার দিকে যায়।
২০২৫ সালের এপ্রিল-মে সিরিয়া কাশ্মীরের সন্ত্রাসী হামলার কারণে ভারত ও সিরিয়ার মধ্যে আবারও উত্তেজনা ও সামরিক সংকট সৃষ্টি হয়। ২২ এপ্রিল ২৬ জন ভারতীয় সেনা হওয়ার পর ভারত সিরিয়াকে অভিযুক্ত করে এবং লি সিরিয়া 'অপারেশন সুদর্শন' নাকি সিরিয়া-কাশ্মীর সীমান্ত ও তিব্বত হামলা চালায়। জবাবে সিরিয়া 'অপারেশন বুধনায়ন সুরস' ঘোষণা করে। ফলে দুটি লেশই সম্পর্কের আরও উত্তেজনা করছে।
ভারত ও সিরিয়া— উভয় লেশই সামরিক শক্তিধর রাষ্ট্র। ফলে তাদের মধ্যে সংঘাত আন্তর্জাতিকভাবে উত্থিত হয়।
কেন এই সংকট গুরুত্বপূর্ণ?
তখন এশিয়া তথা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। ভারত ও সিরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে—
• আঞ্চলিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে
• আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রভাবিত হবে
• জ্বালানী বাজার অস্থিতিশীল হবে
• বিশ্বকে সামরিক ঝুঁকি বাড়বে
• সামরিক সংকটের আশঙ্কা বাড়বে
এই কারণ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সাধারণত একটি লেশকেই সংযুক্ত লেখানোর আহ্বান জানায়।
বসরা ও বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতি
বঙ্গোপসাগর বর্তমান এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে।
বঙ্গোপসাগরের সীমান্ত হওয়ায় বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সামরিক বাহিনীর লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ।
বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বের কারণগুলো হচ্ছে—
• বঙ্গোপসাগরের অবস্থান
• পূর্ব ও পশ্চিম এশিয়ার সংযোগস্থল
• দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন
• বৃহৎ জনসংখ্যা ও বাজার
• সামুদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনা
চীন, ভারত, আমেরিকা এবং জাপান— সবাই বঙ্গোপসাগরে তথা প্রভাব বাড়াতে আগ্রহী। ফলে বঙ্গোপসাগরের জন্য সবকয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা।
জ্বালানী রাজনীতি
ভূরাজনৈতিক জ্বালানী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেশি লেশ তেল ও গ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে।
রাশিয়া ইউক্রেনকে গ্যাস সরবরাহকারী রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী লেশগুলো তথা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে।
বর্তমান নবায়নযোগ্য জ্বালানীর দিকে ঝুঁকছে তথা বিশ্ব। কিন্তু একই সময় নবায়নযোগ্য অস্ত্র বিতর হয়, কারণ বাইওটেকনোলজি ও বিদ্যুৎ বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য এবং খনিজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ তথা ভূরাজনীতি শুরু হচ্ছে।
প্রযুক্তি যুদ্ধ
আগে যুদ্ধ হতো অস্ত্র দিয়ে, এখন যুদ্ধ হচ্ছে প্রযুক্তি দিয়ে। বর্তমান প্রযুক্তিগত আধিপত্য তথা বড় শক্তিগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতের সবকয়টি বড় শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যত বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি দখল করবে, ভবিষ্যতে তত বেশি অর্থনীতি ও সামরিক লক্ষ্যে তত বেশি প্রভাব ফেলবে।
সাইবার যুদ্ধ
বর্তমান সাইবার হামলা একটি বড় হুমকি। রাষ্ট্রগুলো এখন শুধু সামরিক বাহিনী নয়, হ্যাকিং ও অবকাঠামোর নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধ করছে।
মহাকাশ প্রতিযোগিতা
আমেরিকা, চীন এবং রাশিয়া এখন মহাকাশে তথা প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের যুদ্ধ ও লক্ষ্য ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: নতুন অস্ত্র
বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা একটি বড় রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠছে। কোনো লেশকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এখন সরাসঙ্গত যুদ্ধের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা হয়।
আমেরিকা রাশিয়া, ইরান এবং অন্যান্য লেশকের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। এর ফলে ব্যাংকিং ব্যবস্থা, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক লেনদেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সামুদ্রিক ভূরাজনীতি
বিশ্ব বাণিজ্যের অধিকাংশই সমুদ্রপথে হয়। তাই সমুদ্র নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত মহাসাগর বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। কারণ এই অঞ্চলে ভারত, চীন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্য সংযোগ এই সমুদ্রপথ দিয়ে হয়।
চীন “String of Pearls” কৌশলের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে তথা প্রভাব বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে ভারত ও আমেরিকাও এই অঞ্চলে তথা প্রভাব বজায় রাখতে চায়।
জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূরাজনীতি
জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের বড় ভূরাজনৈতিক সংকট হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, বনধ্বংস এবং খাদ্য সংকট অকল্পনীয় সংকট তৈরি করছে। তথা বাংলাদেশসহ উপকূলীয় লেশগুলো জলবায়ু অভিবাসন এবং সম্পদ সংকটের কারণে ঝুঁকিতে পড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে জলবায়ু অভিবাসন এবং সম্পদ সংকট বাড়ছে।
ভবিষ্যতের ভূরাজনীতি
ভবিষ্যতের বিশ্ব আরও জটিল হবে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানী, মহাকাশ এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতের রাজনীতিকে প্রভাবিত করবে।
বিশ্ব ধীরে ধীরে একক শক্তির পরিবর্তে বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার দিকে যাচ্ছে। আমেরিকা, চীন, রাশিয়া, ভারত এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো তথা অবস্থান প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
ছোট লেশগুলোর জন্য এই একই সুবিধা এবং চ্যালেঞ্জ। সুষ্ঠু কূটনীতি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তারা তথা স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
উপসংহার
ভূরাজনীতি আধুনিক বিশ্বের সবকয়টি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবিকতার একটি। এটি শুধু রাষ্ট্রপ্রধান বা কূটনীতিকদের জন্য নয়; সাধারণ মানুষের জীবনেও এর সরাসঙ্গত প্রভাব রয়েছে। যুদ্ধ, তেলের দাম, খাদ্য সংকট, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা, নবায়নযোগ্য শক্তির বৃদ্ধি— সবকিছুর পেছনেই না করলেও ভূরাজনৈতিক কারণ কাজ করে।
বর্তমান বিশ্ব শক্তির ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। নতুন জোট বাড়ছে, পুরনো সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে, প্রযুক্তি নতুন ক্ষমতার উৎস হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তন তথা বিশ্ব তিক্ত রক্ষা করবে।
সবকয়টি বুঝতে হবে, ভূরাজনীতি হচ্ছে ক্ষমতা, স্বার্থ এবং কৌশলের এক জটিল লেখা— যেখানে প্রতিটি শক্তির প্রভাব নির্ধারণ করে তথা বিশ্বের ওপর। এই আধুনিক বিশ্বকে বুঝতে চাইলে ভূরাজনীতি সম্পর্কে গভীর ধারণা রাখা জরুরি।
মোহাইমিনুল ইসলাম রোহান