সম্প্রীতির বন্ধনে গড়ি বাংলাদেশ

সম্প্রীতির বন্ধনে গড়ি বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বহুবিধ সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম ও জাতিসত্তার মিশেলে গঠিত এক অনন্য দেশ। আমাদের ইতিহাস গৌরবোজ্জ্বল, কিন্তু পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। ভাষার জন্য সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় এবং উন্নয়নের পথে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও আমরা এগিয়ে চলেছি। তবে একটি বিষয় সর্বদা গুরুত্বপূর্ণ জাতি হিসেবে আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও সহাবস্থান।

বর্তমান বিশ্বে বৈষম্য, বিভাজন ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গোষ্ঠীগত সংঘাত, ধর্মীয় উগ্রবাদ, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতা সমাজকে দুর্বল করে তুলতে পারে। তাই, এখনই সময় একত্রে চিন্তা করার আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই? একটি বিভক্ত, দাঙ্গা-বিক্ষুব্ধ সমাজ, নাকি এমন একটি দেশ যেখানে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের ভাবতে হবে সম্প্রীতির বন্ধনে গড়ে উঠবে এক উন্নত বাংলাদেশ, যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মানবিক মূল্যবোধ এবং সহনশীলতা থাকবে।

সম্প্রীতি শুধু একটি আদর্শ নয়, এটি একটি বাস্তব শক্তি, যা একটি জাতিকে দৃঢ়ভাবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতি আমাদের উন্নতির মূল চালিকাশক্তি হতে পারে।

সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন সেখানে সহাবস্থান ও পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় থাকে। বাংলাদেশে রয়েছে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষ। তাদের ঐতিহ্য, বিশ্বাস ও রীতিনীতি আলাদা হলেও, আমরা সবাই একই মাটির সন্তান।

বিভিন্ন ধর্মের উৎসবে অংশগ্রহণ, একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা এবং বিপদে পাশে দাঁড়ানো আমাদের চিরন্তন ঐতিহ্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু উগ্রবাদী শক্তি বিভিন্নভাবে সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে। আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের পূর্বপুরুষেরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একসঙ্গে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। তাই আমাদেরও উচিত সেই ঐক্য ধরে রাখা।

রাজনৈতিক বিভেদ একটি জাতির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, যদি সেটি সুস্থ মতবিনিময়ের পরিবর্তে সংঘাতে রূপ নেয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবেই, তবে সেটিকে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে দেখতে হবে, ধ্বংসাত্মক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে নয়। যেখানে রাজনৈতিক দলগুলোর মূল লক্ষ্য দেশের উন্নয়ন হওয়া উচিত, সেখানে আমরা প্রায়ই দেখি, দলীয় স্বার্থে পারস্পরিক দোষারোপ, সংঘাত ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। আমাদের বুঝতে হবে, দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জাতির কল্যাণে কাজ করাই প্রকৃত দেশপ্রেম। সকল রাজনৈতিক দল ও নেতাদের উচিত ন্যায়ের পথে থাকা এবং জনগণের স্বার্থে একত্রে কাজ করা।

ধর্মের মূল শিক্ষা মানবকল্যাণ ও ভালোবাসা, কিন্তু কিছু কুচক্রী গোষ্ঠী এটিকে বিভেদ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির চমৎকার উদাহরণ রয়েছে।

আমরা যদি ফিরে তাকাই, দেখব বুদ্ধ পূর্ণিমায় মুসলিম ভাইরা পাহারার দায়িত্ব নেয়, দুর্গাপূজার সময় হিন্দুদের পাশে দাঁড়ায় মুসলমানরা, বড়দিনে খ্রিস্টানদের আনন্দ ভাগ করে নেয় অন্য ধর্মাবলম্বীরা। এটাই আমাদের প্রকৃত বাংলাদেশ। ধর্মকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে, যদি আমরা এর মূল বার্তা মানবতা, ভালোবাসা ও সহনশীলতা বুঝতে পারি, তাহলে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি হবে না, বরং সবাই আরও কাছাকাছি আসবে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি হাজার বছরের ঐতিহ্যে গড়ে উঠেছে। বাংলার লোকসংগীত, বাউল গান, রবীন্দ্র-নজরুল সাহিত্য, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নৃত্যগীত এসবই আমাদের ঐক্যবদ্ধ সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু কখনো কখনো আমরা আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি অবহেলা করি, অথবা একে অপরের সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করি। এটা বন্ধ করতে হবে। দেশের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে সম্মান জানানো, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী উৎসব উদযাপন করা এবং নিজেদের শেকড়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া আমাদের দায়িত্ব।

বাংলাদেশ কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা নয়, এটি আবেগ, অনুভূতি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মিলনস্থল। জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি আমাদের ঐক্য, আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বিভেদ। যদি আমরা সকল ধর্ম, জাতি, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষ একসঙ্গে কাজ করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশ হবে এক অনন্য শান্তি ও সমৃদ্ধির দেশ।

মানুষের সাথে মানুষের আন্তরিক ও কার্যকর সম্পর্কই পারে বর্তমান সময়ের সংকট থেকে মানব সভ্যতাকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখতে। এটি নিশ্চিত করা আমাদের ঐতিহাসিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য মানবিক বিশ্ব রেখে যেতে আমাদের সকলকে আজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে সম্প্রীতির শপথ নিতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সম্প্রীতির বাংলাদেশ তথা সম্প্রীতির বিশ্ব।

এখন সময় সম্প্রীতির বন্ধনে আরও দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ হওয়ার। বিভেদ নয়, সহিষ্ণুতা; বিদ্বেষ নয়, ভালোবাসা এই আদর্শকে হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা যদি একে অপরের পাশে দাঁড়াই, তাহলে বাংলাদেশ শুধু উন্নতির পথেই এগোবে না, বরং পৃথিবীর জন্য এক সম্প্রীতির উদাহরণ হয়ে উঠবে। আমরা সবাই এক এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার!

ফাহিমা আক্তার
দর্শন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp