বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের নতুন সমীকরণ
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় অর্থনীতিতে নতুন করে আলোচনা ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানি বাজার সুরক্ষিত রাখতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির প্রয়োজনীয়তাও তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে। এলডিসি উত্তরণের পেছনের টানাপোড়েন এবং মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কেন দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ, তা সামগ্রিক বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
১. এলডিসি উত্তরণ: বর্তমান পরিস্থিতি ও সময়সীমার সমীকরণ
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক দিন নির্ধারিত রয়েছে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ উত্তরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়ই বাংলাদেশকে প্রচলিত তিন বছরের পরিবর্তে ব্যতিক্রমীভাবে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল দেওয়া হয়।
বর্তমান সরকার উত্তরণের প্রস্তুতিকাল আরও তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সাল পর্যন্ত নেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সাধারণ পরিষদের কাছে পাঠায়। ইকোসক ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরের আগে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ১৯ অক্টোবর আশা প্রকাশ করেন, অক্টোবরের মধ্যেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত সময়সীমা নয়; সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত নির্ধারিত উত্তরণের তারিখ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বরই বহাল রয়েছে।
২. উত্তরণের সুফল বনাম শঙ্কা
•স্বীকৃতি বনাম রপ্তানি ঝুঁকি: এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশেষ ও অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পায়। উত্তরণ দেশের আর্থসামাজিক অগ্রগতির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হলেও এসব সুবিধার কিছু পর্যায়ক্রমে হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে। তবে উত্তরণের দিন থেকেই সব বাণিজ্যসুবিধা বা সহজ শর্তে উন্নয়ন অর্থায়ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে—এমন নয়; সুবিধাভেদে যোগ্যতা ও পরিবর্তনের সময়সীমা আলাদা। তৈরি পোশাক খাতের উচ্চ রপ্তানিনির্ভরতার কারণে এ খাতের প্রতিযোগিতাসক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
•সম্ভাব্য ক্ষতি: কিছু বিশ্লেষণে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা হারানোর ফলে বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এটি সম্ভাব্য পরিস্থিতিভিত্তিক পূর্বাভাস, নিশ্চিত ক্ষতির হিসাব নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বিকল্প সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে অন্তর্বর্তী সুবিধার মেয়াদ শেষে তৈরি পোশাকে প্রায় ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক প্রযোজ্য হতে পারে। এই হার সব পণ্য বা সব বাজারের জন্য প্রযোজ্য নয়।
•অন্যান্য দৃষ্টিভঙ্গি: উত্তরণের পরও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বাজারে অন্তর্বর্তী বা বিকল্প ব্যবস্থায় শুল্কসুবিধা বজায় থাকার সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে উত্তরণ হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তিন বছরের অন্তর্বর্তী সুবিধা পাওয়ার কথা। যুক্তরাজ্যেও তিন বছরের অন্তর্বর্তী সময়ের পর ডেভেলপিং কান্ট্রিজ ট্রেডিং স্কিমের আওতায় বিস্তৃত শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে মোট রপ্তানি বাজারের ঠিক ৬৭ শতাংশে একইভাবে শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় থাকবে কিংবা বাংলাদেশ মূলত শুধু নগদ প্রণোদনাই হারাবে—এমন সরল সিদ্ধান্ত যথাযথ নয়। বাজারপ্রবেশ, উৎপত্তিবিধি এবং অন্যান্য বিশেষ সুবিধার পরিবর্তন আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
৩. আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা
উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানো বা উত্তরণের সুপারিশ পিছিয়ে দেওয়ার ঘটনা বিশ্ব প্রেক্ষাপটে নতুন নয়। তবে ঘটনাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ধরন এক নয়। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পসহ উন্নয়নের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগের কারণে নেপালের উত্তরণের সুপারিশ ২০১৮ সালের পর্যালোচনায় স্থগিত রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে, ঘূর্ণিঝড় পামের ধ্বংসযজ্ঞের পর ভানুয়াতুর নির্ধারিত উত্তরণ পিছিয়ে ২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর করা হয়। বাংলাদেশ ২০২১ সালের সিদ্ধান্তেই পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকাল পেয়েছিল। ভুটান ২০২৩ সালে এলডিসি উত্তরণ সম্পন্ন করেছে।
এই বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো থেকে তিনটি প্রধান শিক্ষা নেওয়া যায়:
•সুযুক্তির প্রয়োজনীয়তা: কেবল প্রস্তুতির ঘাটতির কথা বলাই যথেষ্ট নয়; সংকট, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং উত্তরণের স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য যুক্তি উপস্থাপন করতে হয়। বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রশ্নেও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।
•অর্থনীতির কাঠামো ও ঝুঁকি: অন্য দেশের অভিজ্ঞতা প্রাসঙ্গিক হলেও সরাসরি তুলনা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তৈরি পোশাকনির্ভর রপ্তানি কাঠামো এবং অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধার ব্যাপক ব্যবহার উত্তরণ-পরবর্তী ঝুঁকির গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক।
•সময় কোনো অলসতার সুযোগ নয়: অতিরিক্ত সময় পাওয়ার অর্থ এই নয় যে কাঠামোগত সংস্কারের কাজ বন্ধ রাখা যাবে। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, শুল্কসুবিধার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং সার্বিক উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা এ সময়ের প্রধান অগ্রাধিকার। প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধের সঙ্গে ব্যাংকিং, করব্যবস্থা ও ব্যবসার পরিবেশ সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও যুক্ত হয়েছে।
৪. মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ: কেন এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ?
এলডিসি সুবিধা সংকুচিত হওয়ার মুখে বিকল্প বাজারসুবিধা নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো দ্বিপাক্ষিক বা আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, উত্তরণের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে এফটিএ আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
বিশেষ করে মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকের পর ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর ঢাকায় প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এখনো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি; এর শর্ত ও সম্ভাব্য সুফল আলোচনার ফলের ওপর নির্ভর করবে। এই চুক্তির সম্ভাবনা মূলত চারটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ।
•বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবিলা: বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে দীর্ঘকাল ধরে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ মালয়েশিয়ায় প্রায় ২৯৩.৫১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, বিপরীতে আমদানি করেছে ২.৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। এফটিএ রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে; তবে পারস্পরিক শুল্কছাড়ে আমদানিও বাড়তে পারে বলে চুক্তি হলেই বাণিজ্য ঘাটতি কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
•নতুন খাতের বিকাশ: বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিএমসিসিআই) মতে, হালাল পণ্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের একটি সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। পাশাপাশি তৈরি পোশাক, চামড়া ও পাদুকা এবং খাদ্য ও কৃষিপণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। হালাল পণ্যের ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি স্বীকৃত সনদ ও মান যাচাইয়ের সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।
•প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ: প্রস্তাবিত চুক্তি বাণিজ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগ, সেবা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য আরও সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি করতে পারে। তবে বিনিয়োগপ্রবাহ কতটা বাড়বে, তা চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত এবং বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।
•ঝুঁকি বহুমুখীকরণ: বাংলাদেশের রপ্তানিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় অংশ রয়েছে। মালয়েশিয়ার মতো বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব জোরদার করা বাজারকেন্দ্রীকরণ কমানোর কৌশলের অংশ হতে পারে। তবে শুধু একাধিক চুক্তি থাকলেই ঝুঁকি কমবে না; সেগুলোর আওতায় বাস্তবে রপ্তানি বাড়ানোও জরুরি।
অবশ্য কেবল চুক্তি স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়। উৎপত্তিবিধি, স্থানীয় মূল্য সংযোজনের শর্ত, পণ্যের মান ও সনদ এবং বাজারে প্রবেশের বাস্তব বাধাগুলো মোকাবিলা করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে। মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় মূল্য সংযোজন ও উৎপত্তিবিধি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হওয়ার কথা রয়েছে। তাই চুক্তির শর্তগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা জরুরি।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন এবং মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ সম্পাদনের উদ্যোগ—দৃশ্যত ভিন্ন মনে হলেও এগুলো একই অর্থনৈতিক কৌশলের দুটি পরিপূরক দিক হতে পারে। অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে তা অভ্যন্তরীণ সংস্কার ও প্রস্তুতি জোরদারের সুযোগ তৈরি করবে; আর কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ এফটিএ বিকল্প বাজারসুবিধা গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারে। সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত যেদিকেই যাক না কেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং বাস্তব সুফলদায়ী বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলার কাজ এগিয়ে নেওয়া জরুরি।