ষোড়শ শতকের শেষ ভাগে বাংলায় মুঘল শাসন প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল কোনো একক রাজবংশ নয়, বরং ছোট ছোট স্থানীয় জমিদার ও সামন্তদের একটি শক্তিশালী জোট। ইতিহাসে তাঁরা “বারো ভূঁইয়া” নামে পরিচিত। “বারো” সংখ্যাটি নির্দিষ্ট বারোজনকে বোঝাত না; ইতিহাসবিদদের মতে, এই স্বাধীনচেতা শাসকের সংখ্যা ছিল আরও বেশি। আবুল ফজলের আকবরনামা এবং মির্জা নাথানের বাহারিস্তান-ই-গাইবী গ্রন্থে বারো ভূঁইয়াদের উল্লেখ থাকলেও, তাঁদের সঠিক সংখ্যা ও তালিকা নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
কারা ছিলেন এই বারো ভূঁইয়া?
শের শাহ সুরির অল্পস্থায়ী সাম্রাজ্য এবং বাংলার সুলতানি আমলের শেষ রাজবংশ কররানিদের পতনের পর, স্থানীয় শাসকেরা প্রায় স্বাধীনভাবে নিজ নিজ অঞ্চল পরিচালনা করতে শুরু করেন। ফলস্বরূপ, ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে মুঘলরা বাংলা দখল করার পরও এঁরা সহজে আত্মসমর্পণ করেননি। পূর্ব ও মধ্য বাংলার নদীমাতৃক ভূগোলে তাঁরা প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল মুঘল অগ্রাভিযান প্রতিহত করেন।
এঁদের অনেকের পূর্বপুরুষ আফগান হলেও এই জোটে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের শাসকেরাই অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—
•সোনারগাঁয়ের ঈশা খাঁ
•যশোরের প্রতাপাদিত্য
•বিক্রমপুরের চাঁদ রায় ও কেদার রায়
•চন্দ্রদ্বীপের কন্দর্পনারায়ণ
•ভাওয়ালের ফজল গাজী ও চাঁদ গাজী
ঈশা খাঁ: প্রতিরোধের প্রতীক ও নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু
বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও আলোচিত নাম ঈশা খাঁ। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী ১৫২৯ সালে তাঁর জন্ম হলেও জন্মস্থান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ তাঁর জন্মস্থান হিসেবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলকে চিহ্নিত করেন, আবার কারও মতে তাঁর মূল কর্মক্ষেত্র ছিল সোনারগাঁ ও জঙ্গলবাড়ি। স্বাধীন শাসকের মর্যাদাসূচক “মসনদ-ই-আলা” উপাধি কীভাবে তিনি লাভ করেছিলেন, সে বিষয়েও একাধিক বর্ণনা রয়েছে। একটি প্রচলিত মতে, আফগান নেতা দাউদ খানের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কারস্বরূপ তিনি এই উপাধি পান।
ঈশা খাঁ বিভিন্ন জমিদারকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি শক্তিশালী সম্মিলিত মোর্চা গড়ে তোলেন। সোনারগাঁ ও জঙ্গলবাড়ির দুর্গ ছিল তাঁর শক্তির প্রধান কেন্দ্র। মুঘল বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করতে এসব দুর্গের চারপাশে প্রশস্ত জলপরিখা খনন করা হয়েছিল। বাংলার নদীমাতৃক ও জলাভূমিপূর্ণ ভূপ্রকৃতি এই প্রতিরোধে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল, কারণ মুঘল সেনা মূলত স্থলযুদ্ধে অভ্যস্ত ছিল।
মানসিংহের অভিযান ও এগারসিন্দুরের যুদ্ধ
সম্রাট আকবরের সেনাপতি মানসিংহ বাংলায় বারবার অভিযান পরিচালনা করেন। ১৫৯৪ থেকে ১৬০৬ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলার সুবাদারের দায়িত্ব পালন করেন; তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল “অবাধ্য” জমিদারদের দমন করা। তিনি প্রতাপাদিত্য ও কেদার রায়কে দমনে আংশিক সফল হলেও ঈশা খাঁর ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েন।
১৫৯৭ সালে কিশোরগঞ্জের এগারসিন্দুরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে মানসিংহের বাহিনী ও ঈশা খাঁর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাত সংঘটিত হয়। প্রচলিত বাংলা ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ঈশা খাঁ মানসিংহের বাহিনীকে প্রতিহত করেন এবং মানসিংহের পুত্র কুমার দুর্জন সিংহ নিহত হন। তবে যুদ্ধের বিস্তারিত ফলাফল নিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনায় ভিন্নতা রয়েছে; নির্ভরযোগ্য সূত্রে একে ঈশা খাঁর সম্পূর্ণ বিজয় হিসেবে নিশ্চিতভাবে দাবি করা যায় না। তবে এটি স্পষ্ট যে, মানসিংহ ঈশা খাঁকে পুরোপুরি দমন করতে ব্যর্থ হন।
নৌশক্তির লড়াই: কেদার রায় ও চাঁদ রায়
বিক্রমপুর ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় কেদার রায় ও চাঁদ রায়ের শক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল। কেদার রায় শ্রীপুরকে কেন্দ্র করে নৌশক্তি গড়ে তোলেন। ১৬০২ সালে মানসিংহ তাঁর বিরুদ্ধে বাহিনী পাঠালে কেদার রায় সম্রাট আকবরের প্রতি আনুগত্যের প্রতিশ্রুতি দেন; তবে বাস্তবে তিনি তাঁর নিজস্ব ক্ষমতা ধরে রাখেন। সে সময় সন্দ্বীপ ও চট্টগ্রাম অঞ্চল মুঘল, পর্তুগিজ ও আরাকানি শক্তির তীব্র সংঘর্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।
ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, ১৬০৩ সালে আরাকানি মগদের সঙ্গে যৌথভাবে ঢাকা অঞ্চলের মুঘল ঘাঁটি আক্রমণের সময় বিক্রমপুরের নিকট মানসিংহের বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে কেদার রায় আহত ও বন্দি হন এবং পরে মারা যান। উল্লেখ্য, মুঘল-আরাকান সংঘাত মূলত চট্টগ্রাম ও সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছিল; ১৬৬৬ সালে মুঘলরা চট্টগ্রাম জয় করে এই দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবসান ঘটায়।
প্রতাপাদিত্য, মুসা খাঁ ও প্রতিরোধ অধ্যায়ের সমাপ্তি
যশোরের প্রতাপাদিত্য ছিলেন এই জোটের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা, যাঁর পতন মুঘলদের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক সাফল্য ছিল। ঈশা খাঁ ১৫৯৯ সালে মারা গেলে তাঁর পুত্র মুসা খাঁ সোনারগাঁয়ের মসনদে বসেন এবং দশ বছরেরও বেশি সময় মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখেন।
পরিশেষে ১৬১০ সালে মুঘল সুবাদার ইসলাম খান মুসা খাঁকে পরাজিত করেন। মুসা খাঁ আত্মসমর্পণ করলে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দি করা হয়। তবে বারো ভূঁইয়াদের কেন্দ্রীয় প্রতিরোধ সম্পূর্ণভাবে ভাঙতে আরও কিছু সময় লাগে; ১৬১১ সালের শেষ নাগাদ বারো ভূঁইয়াদের প্রধান নেতারা ইসলাম খানের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
সে বছরই, অর্থাৎ ১৬১০ সালে, সুবাদার ইসলাম খান বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে ঢাকার নামকরণ করেন “জাহাঙ্গীরনগর”। ঢাকাকে মুঘল বাংলার রাজধানী করার এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত মুঘল প্রশাসনকে এই অঞ্চলে স্থায়ী ও সুদৃঢ় ভিত্তি এনে দেয়।
একটি অসম লড়াইয়ের মূল্যায়ন
বারো ভূঁইয়ার ইতিহাসকে কেবল একরৈখিকভাবে “স্বাধীনতার লড়াই” হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। এই জোটে যেমন স্বাধিকার ও মাতৃভূমি রক্ষার তাগিদ ছিল, তেমনি অনেকে নিজ নিজ জমিদারি ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক বাস্তবতায় মুঘলদের সঙ্গে আপস বা জোটও করেছিলেন।
তবে ঐতিহাসিক সত্য এই যে, মুঘল সাম্রাজ্যের সুসংগঠিত ও বিপুল সেনাবাহিনী, আধুনিক কামান এবং শক্তিশালী নৌবহরের মুখোমুখি হয়েও স্থানীয় এই শাসকেরা প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে যে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা ভারতীয় উপমহাদেশে এক বিরল দৃষ্টান্ত। ঈশা খাঁকে বহু সূত্রে বাংলার স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে স্মরণ করা হলেও এ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যৌক্তিক বিতর্কও রয়েছে।
পরবর্তীতে মুঘলরা বাংলায় নিজেদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হলেও বারো ভূঁইয়াদের বীরত্ব, লড়াই ও প্রতিরোধের স্মৃতি আজও বাংলার লোকগাথা, নাট্যসাহিত্য এবং স্থাপত্যে অমর হয়ে আছে। জঙ্গলবাড়ি দুর্গের ধ্বংসাবশেষ এবং সোনারগাঁর প্রাচীন ইমারতগুলো আজও তাঁদের সেই গৌরবময় অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী বহন করছে।