মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশীয় ভূ রাজনীতিতে বদর স্মারক

মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশীয় ভূ রাজনীতিতে বদর স্মারক
চার মুসলিম দেশের কৌশলগত নৈকট্য

গত ২১ অক্টোবর কাতারের রাজধানী দোহায় পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে ‘বদর মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (MoU) নামের একটি বহুপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কাতার সরকারি সংবাদ সংস্থা কিউএনএ, তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, দেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে এই স্মারকে সই হয়। এর মূল লক্ষ্য—প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা।

‘বদর’ নামের তাৎপর্য ও মূল লক্ষ্য

তুর্কি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আরবি ‘বদর’ শব্দের অর্থ ‘পূর্ণিমার চাঁদ’। এই সমঝোতার প্রাথমিক লক্ষ্য হিসেবে প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, অংশীদার দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার এবং যৌথ গবেষণা ও উন্নয়নে কাজ করার কথা জানানো হয়েছে।

স্মারকটি বিশেষভাবে তিনটি ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলছে: প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির গবেষণা-উন্নয়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তর; প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে শিল্পখাতভিত্তিক অংশীদারিত্ব; এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের মানবসম্পদ উন্নয়ন।

এটি কি একটি সামরিক জোট?

সংবাদ শিরোনামে প্রায়ই ‘চুক্তি’ বা ‘জোট’ শব্দ ব্যবহার করা হলেও, আইনি দিক থেকে এটি একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ বা MoU। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই স্মারকে ‘পারস্পরিক প্রতিরক্ষা’ সংক্রান্ত কোনো বাধ্যবাধকতামূলক ধারা নেই। অর্থাৎ, স্বাক্ষরকারী কোনো দেশ আক্রান্ত হলে বাকি দেশগুলোর সামরিক হস্তক্ষেপের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি হচ্ছে না। ফলে এখনই এটিকে পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট বলা যাবে না।

মক্কা চুক্তির সঙ্গে মূল পার্থক্য

বিষয়টি বোঝার জন্য গত ৭ আগস্ট তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ওই চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর বাইরে থেকে সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা বাকি সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে।

তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের মতে, এটি কারিগরিভাবে ন্যাটোর ‘৫ নম্বর অনুচ্ছেদের’ মতো একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, তবে কোনো নির্দিষ্ট দেশের—যেমন ইরানের—বিরুদ্ধে নয়। সে তুলনায় ‘বদর স্মারক’ কোনো নিরাপত্তা জামানতের চুক্তি নয়; বরং মূলত প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি ও উৎপাদনভিত্তিক একটি কৌশলগত সহযোগিতা।

ভূ-রাজনীতি ও আঞ্চলিক সমীকরণে প্রভাব

দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে এ ধরনের সহযোগিতায় পাকিস্তানের ভূমিকা বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। এর আগে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তির সময় নয়া দিল্লি বিষয়টির ওপর গভীর পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছিল। তবে বদর স্মারক নিয়ে ভারত কিংবা পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। ফলে নতুন কোনো ভূ-রাজনৈতিক অক্ষ তৈরি হচ্ছে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।

সংক্ষেপে বলা যায়, ‘বদর সমঝোতা স্মারক’ কোনো সরাসরি সামরিক জোট নয়। তবে চার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রতিরক্ষা শিল্প, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা-উন্নয়নের এই নৈকট্য ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সমন্বয়ের পথ সুগম করতে পারে। এই উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের যৌথ প্রকল্প, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও শিল্পখাতভিত্তিক অংশীদারিত্ব বাস্তবায়নের ওপর।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp