সাজেকে অবরোধ ও গোলাগুলি

সাজেকে অবরোধ ও গোলাগুলি
সাজেকে অবরোধ ও গোলাগুলির অভিযোগ: আটকে পড়া পর্যটকদের উদ্ধার ও ঘটনা প্রবাহ

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাঙামাটির সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আটকে পড়া পর্যটকদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার সময় সংঘর্ষ ও গুলিবিনিময়ের অভিযোগ উঠে। যৌথ বাহিনীর নিরাপত্তায় ২,৯৩৩ জন পর্যটককে উদ্ধার করা হলেও গোলাগুলির সূচনাকারী নিয়ে প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ তৈরি হয়েছে।

♦আটকে পড়া পর্যটকদের উদ্ধার ও সার্বিক পরিস্থিতি

সাজেকে চলমান অবরোধের মধ্যে উজোবাজার এলাকায় আটকে পড়া বিপুলসংখ্যক পর্যটককে বিশেষ নিরাপত্তায় সরিয়ে নেওয়া হয়। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) বিবৃতিতে উদ্ধারকৃত পর্যটকের সংখ্যা “প্রায় তিন হাজার” বলা হয়েছে, আর স্থানীয় প্রশাসন ও সংবাদ প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা হিসেবে ২,৯৩৩ জনের উল্লেখ রয়েছে।

ঘটনায় হতাহতের বিষয়েও এসেছে পরস্পরবিরোধী তথ্য:
•আইএসপিআর: বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

•সাজেক থানা পুলিশ: সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, অবরোধকারীদের ইট-পাটকেলের আঘাতে কিছু পর্যটক আহত হয়েছেন।

•জেলা পুলিশ প্রশাসন: জেলা পুলিশ সুপারের দাবি, সংঘর্ষ চলাকালে সেনাবাহিনী ও পুলিশের ছয়জন সদস্য আহত হয়েছেন।

♦অবরোধের নেপথ্য কারণ ও স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ

অবরোধের ডাক দেয় ‘সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি’ এবং ‘সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন’। সংগঠন দুটির দাবি, গত ১১ অক্টোবর প্রথম দফায় অবরোধ শুরুর পর স্থানীয় প্রশাসন জেএসএস-সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবি পূরণের আশ্বাস দেয়। সেদিনই ওই আশ্বাসের ভিত্তিতে অবরোধ স্থগিত করা হয়।
পরে দাবি বাস্তবায়িত না হওয়ার অভিযোগে ২১ অক্টোবর সংগঠন দুটি পুনরায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা দেয়। শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হলেও ২২ অক্টোবর সকাল থেকে তা পুনরায় শুরু হয়।
পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ঘটনার ব্যাখ্যায় একাধিক মাত্রা যুক্ত হয়েছে:
•সংগঠন দুটির দাবি: তাদের মূল অভিযোগ আঞ্চলিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে।

•পুলিশের বক্তব্য: জেলা পুলিশ সুপারের মতে, আন্দোলনরত এই সংগঠন দুটি মূলত ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) প্রভাবে পরিচালিত এবং পুরো ঘটনাটি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের বিরোধ থেকে সৃষ্ট।

•জেএসএস-এর অবস্থান: জেএসএস-এর তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে এটিকে ইউপিডিএফ-এর বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন।

♦গোলাগুলির ঘটনায় দুই বিপরীতমুখী অবস্থান

•প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য: আইএসপিআর-এর তথ্যানুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে গঙ্গারাম বাজার এলাকায় ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা স্থানীয় লোকজনকে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সড়ক অবরোধ করেন এবং পর্যটক ও নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ রয়েছে। পরে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে; নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সেনা টহল দল আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালালে তারা পিছিয়ে যায় বলে আইএসপিআর জানিয়েছে।

•ইউপিডিএফ-এর বক্তব্য: ইউপিডিএফ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই দাবিকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি পণ্ড করতে নিরাপত্তাবাহিনীই একতরফাভাবে গুলি বর্ষণ করেছে।

উল্লেখ্য, উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি দাবির সত্যতা এখনো কোনো নিরপেক্ষ বা স্বাধীন সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

♦পর্যটন খাতে প্রভাব ও স্থানীয় পরিস্থিতি

ঘটনার আগের দিনই মূল আয়োজক সংগঠন দুটি পর্যটকদের বুধবারের মধ্যে সাজেক ত্যাগ করার অনুরোধ জানিয়েছিল। তা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক পর্যটক সেখানে আটকে পড়েন; পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সশস্ত্র পাহারায় তাদের বহর করে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সাজেক থানা পুলিশ জানিয়েছে, এলাকাটিতে বর্তমানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সড়ক অবরোধের ফলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও হোটেল-রিসোর্ট খাতে ব্যবসায়িক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।

♦পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও মূল প্রশ্নসমূহ

১. অবরোধের স্থায়িত্ব: আয়োজক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, সশস্ত্র গ্রুপটিকে অপসারণ না করা পর্যন্ত তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
২. প্রশাসনের ভূমিকা: আন্দোলনকারীদের উত্থাপিত তিন দফা দাবি নিয়ে প্রশাসন নতুন কোনো আলোচনা বা পদক্ষেপ নেবে কি না।
৩. নিরপেক্ষ তদন্ত: ঘটনা ও গোলাগুলির অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানে কোনো স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠিত হয় কি না।
৪. পর্যটন পুনরায় চালুর সময়সূচি: পাহাড়ি এই সীমান্ত সড়কে পর্যটকবাহী যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগতে পারে।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp