আজ দুর্গাপূজার মণ্ডপে অনেক মুসলমানকে যেতে দেখা যাচ্ছে। কেউ শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, কেউ সৌহার্দ্য প্রকাশ করছেন। অনেকে এটাকেই সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সম্প্রীতি কি শুধু এক পক্ষের অংশগ্রহণেই প্রতিষ্ঠিত হয়, নাকি এর জন্য উভয় পক্ষের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন?
বাংলাদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ, ভারতে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব হলো সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। একইভাবে সংখ্যালঘুদেরও উচিত অন্যের ধর্মীয় অনুভূতি, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। সম্প্রীতি কোনো একতরফা অনুগ্রহ নয়; এটি পারস্পরিক সম্মান ও দায়িত্ববোধের সম্পর্ক।
বাংলাদেশের মুসলমানরা যদি হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবে শুভেচ্ছা জানায়, তাদের নিরাপত্তায় পাশে দাঁড়ায় এবং ধর্ম পালনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করে, তাহলে সেটি অবশ্যই ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলা যায়—ভারতে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী ও রাষ্ট্র কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে? কোথাও মুসলমানদের ওপর হামলা, ধর্মীয় বিদ্বেষ কিংবা বৈষম্যের ঘটনা ঘটলে তার নিরপেক্ষ বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিত হচ্ছে কি?
সম্প্রীতির প্রকৃত পরীক্ষা উৎসবের ছবি নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান।
বাংলাদেশেও হিন্দু সম্প্রদায়ের কেউ যদি বৈষম্য বা নির্যাতনের শিকার হন, তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আবার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি মিথ্যা অভিযোগ করে, সাম্প্রদায়িক উসকানি দেয় কিংবা অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তাহলে তারও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বানানো যেমন অন্যায়, তেমনি প্রকৃত অপরাধকে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আড়াল করাও অন্যায়।
একই নীতি ভারত, বাংলাদেশ কিংবা পৃথিবীর যেকোনো দেশের জন্য প্রযোজ্য। কোনো দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীকে যেমন সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় দায়িত্বশীল হতে হবে, তেমনি প্রত্যেক নাগরিকেরও রাষ্ট্রের আইন ও অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রয়োজন।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোনো সম্প্রদায়ের কয়েকজন ব্যক্তির বক্তব্য বা আচরণের ভিত্তিতে পুরো সম্প্রদায়কে অকৃতজ্ঞ, ষড়যন্ত্রকারী কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করা ন্যায়সংগত নয়। কোনো মন্দির নির্মাণ, ধর্মীয় ছুটি, প্রতিমা বিসর্জন কিংবা ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক থাকলে তা আইন, পরিবেশনীতি ও নাগরিক অধিকারের আলোকে বিবেচনা করা উচিত। ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় স্বাধীনতার বাস্তবতা নিয়েও তথ্যভিত্তিক আলোচনা প্রয়োজন; অনুমান দিয়ে কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থান বিচার করা ঠিক নয়।
আমার বক্তব্য কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। আমার বক্তব্য হলো—সম্প্রীতির নামে এক পক্ষের কাছ থেকে শুধু ছাড় প্রত্যাশা করা যাবে না, আবার অন্য পক্ষের ন্যায্য অধিকারও অস্বীকার করা যাবে না।
বাংলাদেশের মুসলমানদের উদারতা যদি সম্প্রীতির উদাহরণ হয়, তাহলে ভারতের মুসলমানদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করাও সম্প্রীতিরই অংশ। একইভাবে বাংলাদেশে হিন্দুদের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা সংখ্যাগরিষ্ঠের দায়িত্ব, আর প্রত্যেক নাগরিকের উচিত পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা।
ধর্ম যার যার, নাগরিক অধিকার সবার। ন্যায়বিচার সবার জন্য, নিরাপত্তা সবার জন্য এবং আইনের প্রয়োগও সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।
সম্প্রীতি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমান অধিকার, ন্যায়বিচার এবং দায়িত্বশীল আচরণের বাস্তব প্রতিফলন।
মোহাম্মদ জাহিদ হাসান
ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি
বাঙলা ক্যাম্পাস