শারদীয় দুর্গোৎসব বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। এ বছর ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া পূজা ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা হয়েছে—গত বছরের তুলনায় ৪৯৬টি বেশি।
নিরাপত্তায় সমন্বিত প্রস্তুতি
পুলিশের মহাপরিদর্শক জানিয়েছেন, প্রায় ৩৩ হাজার মণ্ডপে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যাতে কোনো গোষ্ঠী উৎসবকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে। এ ছাড়া পূজার নিরাপত্তায় সারা দেশে প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার আনসার ও ভিডিপি সদস্য এবং প্রায় ১০ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েনের কথা জানানো হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপতথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির বিরুদ্ধে সাইবার নজরদারি জোরদার করেছে বলে জানিয়েছে। ফেনীর জেলা প্রশাসকও বলেছেন, গুজব বা অতিরঞ্জিত তথ্য ছড়িয়ে পড়া রোধে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে কন্ট্রোল রুম খোলা রাখা হবে।
জেলায় জেলায় আয়োজন
কক্সবাজারে এবার ৩২৪টি মণ্ডপে পূজা হয়েছে; এর মধ্যে ১৫৪টি প্রতিমাপূজা এবং ১৭০টি ঘটপূজার মণ্ডপ। ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে বিশেষ নজরদারি এবং এসআরবির মোবাইল ও স্ট্রাইকিং রিজার্ভ দল নিয়োজিত ছিল।
ফেনীর ছয় উপজেলায় ১৫৩টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন হয়েছে, যা গত বছরের চেয়ে তিনটি বেশি। দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁওয়ের ৯৯ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় ৮৬টি মণ্ডপের নিরাপত্তায় ১৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন ছিল।
শান্তিপূর্ণ উৎসবের দাবি
মাঠপর্যায়ের বিবরণে দেখা যায়, প্রশাসন, পুলিশ, আনসার-ভিডিপি, বিজিবি ও পূজা উদযাপন পরিষদ একসঙ্গে কাজ করেছে। ঢাকা মহানগরে পূজার মূল দিনগুলোতে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি বলে আনসার-ভিডিপির মহাপরিচালক জানিয়েছেন। তবে এটি প্রশাসনিক দাবি; সারা দেশের জন্য স্বাধীন ও সামগ্রিক মূল্যায়ন হিসেবে এখনো এটিকে দেখা যাবে না।
অনলাইনে দেবী দুর্গা নিয়ে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য ও হেটস্পিচের উপস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেই বিদ্বেষকে মাঠে সহিংসতায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা এবার তুলনামূলকভাবে প্রতিহত হয়েছে বলেই জেলাভিত্তিক সংবাদ ও প্রশাসনের বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও সতর্কতা
প্রথম কলকাতা প্রশ্ন তুলেছে—নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশের প্রথম দুর্গাপূজা কেমন হলো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে একে “স্বাধীনতার পর অন্যতম শান্তিপূর্ণ পূজা” বলে অভিহিত করেছেন এবং এটিকে ৫ আগস্টের পরিবর্তনের রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখেছেন। এ ধরনের মন্তব্যে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগবিহীন বাংলাদেশে পূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়া প্রমাণ করে যে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া কৃতিত্ব নয়। যদিও এক বছরের তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ আয়োজন কোনো দলের ঐতিহাসিক ভূমিকা বা অতীতের সব সাম্প্রদায়িক সহিংসতার হিসাব মুছে দেয় না। বরং এর মূল বার্তা হলো—রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় সমাজ ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা যৌথভাবে কাজ করলে উৎসব নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে পালিত হতে পারে।
সম্প্রীতির আসল অর্থ
এই আনন্দ শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের নয়; এটি মুসলমান, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধসহ সব নাগরিকের। ঈদ যেমন সবার আনন্দ, পূজাও তেমনি সবার উৎসব—এই উপলব্ধিই বহুত্ববাদী বাংলাদেশের মূল শক্তি। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এবং ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশায়, ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
হাসিনা আমলের রেখে যাওয়া বিভাজন ও ঘৃণার জায়গাগুলো ভালোবাসা, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা দিয়ে সাজানোর প্রতিশ্রুতি এবারের পূজার সবচেয়ে বড় প্রতীকী অর্থ। তবে সম্প্রীতি কোনো একক উৎসবের সাফল্যে স্থায়ী হয় না; এটি নির্ভর করে বছরের প্রতিটি দিনে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি, জীবন, ভোটাধিকার ও মর্যাদা রক্ষার ওপর।
এবারের দুর্গাপূজা দেখিয়েছে, প্রশাসনিক প্রস্তুতি, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, সাইবার নজরদারি এবং সাধারণ মানুষের দায়িত্ববোধ একসঙ্গে কাজ করলে বিদ্বেষকে সহিংসতায় রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ নিশ্চয়তাই বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আসল ভিত্তি।