সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড তথ্য পৌঁছাল সাজা কার্যকরের পর

সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড তথ্য পৌঁছাল সাজা কার্যকরের পর
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের। তবে সাজা কার্যকর হওয়ার পর বিষয়টি জানতে পেরেছে ঢাকা। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে তাঁদের ‘তাজির’ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং রাজকীয় আদেশের মাধ্যমে তা কার্যকরের অনুমোদন পায়। এ ঘটনার পর প্রবাসী বাংলাদেশি বন্দিদের বিচারিক তথ্যের তদারকি ও কূটনৈতিক সহায়তার বিদ্যমান ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

১) ঘটনার বিবরণ

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির বরাতে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি জানায়, গত ১৪ অক্টোবর ২০২৬ (৩ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪৮ হিজরি) মক্কা অঞ্চলে নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির ও সিতি আক্তার নামের দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। পবিত্র মক্কা নগরীর একটি মসজিদের ভেতরে অত্যন্ত অমর্যাদাকর ও গুরুতর নৈতিক অপরাধ সংঘটিত করার অভিযোগে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী দুজনকে গ্রেপ্তার করে তদন্ত শেষে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে এবং মামলাটি যোগ্য আদালতে পাঠায়। আদালত দুজনকে দোষী সাব্যস্ত করে অপরাধের গুরুত্ব এবং পবিত্র স্থান ও পবিত্র সময়ের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার কারণে তাঁদের ‘তাজির’—অর্থাৎ ইসলামি আইনে বিচারকের বিচক্ষণতামূলক শাস্তির—আওতায় মৃত্যুদণ্ড দেয়।

২) রায় চূড়ান্ত ও রাজকীয় আদেশ

সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, সংশ্লিষ্ট বিচারিক কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখার পর শরিয়াহভিত্তিক শাস্তি কার্যকরের জন্য রাজকীয় আদেশ জারি করা হয়। এরপর ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

বিবৃতিতে সৌদি সরকার বলেছে, মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা, ন্যায়বিচার নিশ্চিত এবং ইসলামি শরিয়াহর বিধান বাস্তবায়নে দেশটি অঙ্গীকারবদ্ধ। একই সঙ্গে এ ধরনের কাজের পরিণতি সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।

৩)ঘটনা জানার পর ঢাকার পদক্ষেপ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম নিশ্চিত করেছেন, ১৪ অক্টোবর সাজা কার্যকরের দিনই বাংলাদেশ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়। সাজা কার্যকরের আগে সৌদি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ বা জেদ্দায় অবস্থিত দেশটির কনস্যুলেট জেনারেলকে কোনো আগাম বার্তা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।

৪) ঘটনার পর কূটনৈতিক স্তরে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে:

•নোট ভার্বাল প্রেরণ: ঘটনার পরদিন, ১৫ অক্টোবর, জেদ্দার বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে কূটনৈতিক পত্র পাঠায়।

•রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ: ১৮ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং বিষয়টি তোলেন।

•নোট ভার্বালের হার্ড কপি: ইলেকট্রনিক চ্যানেলে পাঠানো নোট ভার্বালের একটি কাগজে-কলমে অনুলিপি ১৮ অক্টোবর সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

•রায়ের অনুলিপি চাওয়া: ঢাকা সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আদালতের রায়ের অনুলিপিসহ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিস্থিতি ও বিস্তারিত ব্যাখ্যা চেয়েছে।

৫) প্রাতিষ্ঠানিক ও তদারকিগত দুর্বলতা

এ ঘটনার মধ্য দিয়ে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি বন্দিদের কনস্যুলার ও আইনি সেবা দেওয়ার কাঠামোগত কিছু দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে:

•তালিকায় তথ্যের অসম্পূর্ণতা: সৌদি কর্তৃপক্ষ আগে বাংলাদেশ মিশনকে বন্দিদের একটি তালিকা দিয়েছিল, যেখানে এই দুজনের নাম ও তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের উল্লেখ ছিল। তবে সেই তালিকায় তাঁরা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত—এমন তথ্য ছিল না।

•আগাম সতর্কতার অভাব: তালিকায় মামলার বর্তমান অবস্থা, দণ্ডাদেশ বা আপিলের হালনাগাদ বিবরণ না থাকায় মৃত্যুঝুঁকিতে থাকা বন্দিদের আগাম চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি।

•সীমাবদ্ধ সক্ষমতা: প্রবাসী বাংলাদেশির সংখ্যার তুলনায় মিশনের প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং বন্দিদের আইনি ঝুঁকি নিয়মিত ট্র্যাক করার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

•পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ: মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নারীর পরিবারের দাবি, তিনি কারাগার থেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহায়তা কতটা কার্যকর ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

•দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া: প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দুজনই ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে আটক ছিলেন। অর্থাৎ গ্রেপ্তার, বিচার ও দণ্ড কার্যকরের মধ্যে দীর্ঘ সময় ছিল; এ সময়ে মিশনের তদারকি কতটা সক্ষম ছিল, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

৬) আইনি ও কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, কনস্যুলার সম্পর্ক বিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তাঁকে কনস্যুলার সহায়তা পাওয়ার অধিকার সম্পর্কে জানাতে হয় এবং তাঁর সম্মতিক্রমে নিজ দেশের দূতাবাসকে অবহিত করা উচিত। সৌদি আরবে শরিয়াহভিত্তিক বিচারব্যবস্থায় গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রয়েছে। তাই এ ধরনের মামলায় শুরুর পর্যায় থেকেই নিবিড় আইনি তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি।

৭) ভবিষ্যৎ করণীয়

প্রবাসীদের স্থানীয় আইন মেনে চলার আহ্বানের বাইরেও সরকারি পর্যায়ে সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে:

•সম্পূর্ণ তথ্যের বাধ্যবাধকতা: সৌদি কর্তৃপক্ষের পাঠানো তালিকায় মামলার ধরন, দণ্ডাদেশ এবং আপিলের হালনাগাদ তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার কূটনৈতিক তাগিদ দেওয়া।

•উচ্চ ঝুঁকির তালিকা তৈরি: মৃত্যুদণ্ড বা দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডের মুখোমুখি বন্দিদের জন্য আলাদা ডেটাবেস তৈরি করে অগ্রাধিকারভিত্তিক তদারকি করা।

•স্বতঃপ্রণোদিত কনস্যুলার সেবা: আবেদনের জন্য অপেক্ষা না করে গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্তদের ক্ষেত্রে দূতাবাস বা কনস্যুলেটের পক্ষ থেকে উদ্যোগী হয়ে আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করা।

•দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা: মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে নিশ্চিতভাবে পূর্ব-সংকেত বা নোটিশ দেওয়ার বিষয়ে সৌদি সরকারের সঙ্গে সুনির্দিষ্ট সমঝোতায় পৌঁছানো।

সৌদি কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত জবাব, আদালতের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এবং বিচার ও আপিল প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা সংক্রান্ত তথ্য হাতে পাওয়ার পরই পুরো বিষয়টি স্পষ্ট হবে। একই সঙ্গে প্রবাসে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের সুরক্ষায় কূটনৈতিক মিশনগুলোর দায়িত্ব, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও তদারকি জোরদার করা জরুরি।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp