হরমুজে মাইন বিস্ফোরণ ও কাতারের সতর্কবার্তা তীব্রতর হচ্ছে কি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট?

হরমুজে মাইন বিস্ফোরণ ও কাতারের সতর্কবার্তা তীব্রতর হচ্ছে কি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট?
১৭ অক্টোবর, শনিবার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস নেভি দাবি করে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় নৌ-মাইনে আঘাত লেগে দুটি জ্বালানিবাহী ট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ (IRNA)-র তথ্যমতে, প্রতিটি ট্যাংকারে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল করে অপরিশোধিত তেল ছিল। তবে জাহাজ দুটির নাম, মালিকানা কিংবা তেলের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি; ফলে ঘটনাটি এখনো মূলত ইরানি কর্তৃপক্ষের দাবির ভিত্তিতেই জানা যাচ্ছে।

ঘটনার নেপথ্য ও বর্তমান পরিস্থিতি

ইরানি সংবাদমাধ্যমের দাবি অনুযায়ী, প্রথম ট্যাংকারটিতে মাইনের আঘাতে বিস্ফোরণ ঘটে এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ে; কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় ট্যাংকারটিতেও মাইনের আঘাত লাগে। ইরানের দাবি অনুযায়ী, জাহাজগুলো পজিশনিং ও রাডার সিস্টেম বন্ধ রেখে অনুমোদিত পথের বাইরে দিয়ে প্রণালী পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছিল।

উল্লেখ্য, ফেব্রুয়ারির শেষভাগে, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালী ঘিরে উত্তেজনা বেড়েছে। এই নৌপথ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন রুট।

কেন বাড়ছে সংঘাত ও হামলা?

ইরানি কর্তৃপক্ষের বর্ণনায়, দেশটির মূল বন্দর ও রপ্তানি অবকাঠামোর ওপর মার্কিন চাপ এবং নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপটে তারা এই অঞ্চলে অবস্থান শক্ত করছে। তবে এই ব্যাখ্যা মূলত তেহরানের পক্ষ থেকেই আসছে।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অবশ্য উত্তেজনার তীব্রতা নির্দেশ করে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর অ্যাডভাইজরি সংস্থা ‘ইউকেএমটিও’ (UKMTO)-র তথ্যমতে, অক্টোবরের প্রথম ১৫ দিনে প্রণালী ও আশপাশের এলাকায় অন্তত ২৬টি বাণিজ্যিক জাহাজ সংক্রান্ত আক্রমণ বা নিরাপত্তা ঘটনা রেকর্ড হয়েছে—যা যুদ্ধ শুরুর পর এক মাসের সর্বোচ্চ সংখ্যা। ইউকেএমটিও আরও জানায়, ১৬ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে ১২টি জাহাজ আক্রমণের শিকার হয়, যার মধ্যে ১০টি ঘটনা হরমুজ প্রণালীতে ঘটে। সংস্থাটি বলছে, অধিকাংশ লক্ষ্যবস্তু জাহাজ ঘটনার রিপোর্ট দিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে বলে প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করাও কঠিন হচ্ছে।

দোহার উদ্বেগ ও কাতারের সতর্কবার্তা

দোহার গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ সাউদ বিন আবদুর রহমান আল থানি জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তেল ও গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি; আগামী মাসগুলোতে দাম ও ভোক্তাপর্যায়ে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে।
তাঁর উদ্বেগের প্রধান দিকগুলো হলো:
•উৎপাদন অবকাঠামোর ক্ষতি: গত মার্চে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের ‘রাস লাফান’ শিল্প কমপ্লেক্সের দুটি এলএনজি উৎপাদন ট্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কাতারের এলএনজি রপ্তানি ক্ষমতা প্রায় ১৭ শতাংশ কমে যায় এবং বার্ষিক প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়ে। কাতারএনার্জির হিসাবে, পুরোপুরি মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর লাগতে পারে।

•অতিরিক্ত ট্রানজিট ফি আদায়: কাতার হরমুজ প্রণালীতে ট্রানজিট ফি আরোপের বিরোধিতা করেছে। শেখ সাউদ বলেন, এ ধরনের ফি আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং প্রণালীতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করলে তার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হবে বিশ্বব্যাপী ভোক্তাদের।

•কূটনৈতিক ভারসাম্য ও নতুন জোট: কাতার তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও নতুন প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছে।

লোহিত সাগরে বাড়তি চাপ

হরমুজ প্রণালীতে ঝুঁকি বাড়লে বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগর রুটের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। কিন্তু ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি এই রুটকেও অনিরাপদ করে তুলেছে। সম্প্রতি সৌদি সামরিক বাহিনী কয়েকটি হুতি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে বলে জানা গেছে; এসব হামলার লক্ষ্য বলে দাবি করা হয়েছে দেশটির কৌশলগত ইয়ানবু রপ্তানি টার্মিনালকে।

এদিকে, লোহিত সাগরের ঝুঁকি এড়াতে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তথ্য অনুযায়ী, এই রুটে দৈনিক গড়ে প্রায় ৪৯টি জাহাজ যাতায়াত করত, যা ১১ অক্টোবর পর্যন্ত গণনাভিত্তিক ২০২৬ সালে বেড়ে প্রায় ৯১টিতে পৌঁছেছে।

বিশ্ব অর্থনীতি ও উদীয়মান বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব

•জ্বালানি তেলের বাজার: সম্প্রতি ব্রেন্ট ক্রুডের দাম মে মাসের পর প্রথমবার ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার ছুঁয়েছে এবং পরে ১০৯.৮৬ ডলারে বন্ধ হয়। বিশ্লেষকদের মতে, উত্তেজনা প্রশমিত হলে দাম কমতে পারে; তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে তা আরও ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

•পরিবহন ও বিমা মাশুল: হরমুজ দিয়ে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ যুদ্ধপূর্ব গড়ের প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে—অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস। এর সঙ্গে জাহাজ ভাড়া, শিপিং লজিস্টিকস ও বিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি তেলের সরবরাহ সংকটের চেয়েও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। ইউকেএমটিওর আলাদা হিসাবে, প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব স্তরের চেয়ে প্রায় ৭০ শতাংশ কম।

•আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর প্রভাব: জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজ ভাড়া ও বিমা মাশুল একসঙ্গে বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে। ফলে বাংলাদেশের মতো নিট আমদানিকারক দেশগুলোর মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে, যা অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতি, পরিবহন খরচ ও খাদ্য উৎপাদন ব্যয় বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

সার্বিক পর্যালোচনা

দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে অগ্নিকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সামরিক ঘটনা নয়; এটি হরমুজ প্রণালীর ভূরাজনীতি, আঞ্চলিক সংঘাত এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সম্মিলিত প্রভাবের অংশ। তবে হরমুজের এই নির্দিষ্ট মাইন বিস্ফোরণের বিষয়ে এখনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক যাচাই নেই।
বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারের গতিপথ মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে:
১)হরমুজের অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত বা নিরপেক্ষ তথ্যের সত্যতা যাচাই।
২)ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সম্ভাব্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কূটনৈতিক যোগাযোগের গতিপ্রকৃতি।
৩)লোহিত সাগরে হুতিদের সামরিক তৎপরতার পরিধি এবং তার প্রতিক্রিয়া।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp