কম্বোডিয়ায় আটকে ১,৮০০ বাংলাদেশি

কম্বোডিয়ায় আটকে ১,৮০০ বাংলাদেশি
কম্বোডিয়ায় আটকে ১,৮০০ বাংলাদেশি: ৩১ অক্টোবরের আল্টিমেটাম ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

উচ্চ বেতনের প্রলোভন, ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতি আর সাইবার স্ক্যামিং চক্রের ফাঁদ—সব মিলিয়ে কম্বোডিয়ায় আটকে পড়েছেন এক হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি। ৩১ অক্টোবরের ডেডলাইন যত ঘনিয়ে আসছে, বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার আকুতি তত তীব্র হচ্ছে। তবে আইনি জটিলতা, জমানো ঋণের বোঝা আর প্রশাসনিক ধীরগতির কারণে এই অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তায়।

কতজন আটকে আছেন?

পরিসংখ্যান নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সূত্রের তথ্যে কিছুটা অমিল রয়েছে। সরকারি হিসেবে দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন প্রায় ১,৩০০ থেকে ১,৪০০ জন। অন্যদিকে, পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তায় নিয়োজিত সংগঠন ‘অনির্বাণ সারভাইভার ভয়েস ফাউন্ডেশন’-এর দাবি, আটকে থাকা প্রবাসীর সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। তাদের মতে, এর মধ্যে অন্তত ১,৮০০ জন ৩১ অক্টোবরের সময়সীমা নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। এই সময়সীমাটি কম্বোডিয়ার অভিবাসন-সংক্রান্ত ওভারস্টে জরিমানা মওকুফের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত।

কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশের স্থায়ী দূতাবাস না থাকায় ব্যাংককের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে কনসুলার সেবা দেওয়া হয়। ব্যাংকক মিশনের শ্রম সংক্রান্ত কর্মকর্তা জানান, তারা ইমেইল, ফোন, সরাসরি আবেদন ও কমিউনিটির মাধ্যমে ১,৭৯৬ জনের অনুরোধ পেয়েছেন। জুলাইয়ের পর প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ জন দেশে ফিরেছেন। তবে সবার পরিচয় ও বর্তমান অবস্থান নিখুঁতভাবে যাচাই করা সম্ভব না হওয়ায় ১,৮০০ সংখ্যাটিকে একটি সম্ভাব্য চিত্র হিসেবেই ধরা হচ্ছে।

বৈধ ছাড়পত্র থেকে পাচারচক্রের ফাঁদ

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫,৯৬৩ জন বাংলাদেশি কম্বোডিয়ার জন্য কর্মসংস্থান ছাড়পত্র পান।

ভুক্তভোগীদের প্রায় প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা একই রকম। বৈধ চাকরির লোভ দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় নেওয়ার পর তাঁদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং জোরপূর্বক বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে জিম্মি করে অবৈধ কাজে বাধ্য করা হয়। এসব কম্পাউন্ডে হুমকি, চাঁদা দাবি এবং পালানোর চেষ্টা করলে অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।

এই চক্রের ভয়াবহতার প্রমাণ মেলে চলতি বছরের ৮ অক্টোবর, যখন কম্বোডিয়া থেকে তিন বাংলাদেশির লাশ দেশে ফেরত আনা হয়। তাঁদের একজন ঝিনাইদহের ২৩ বছর বয়সী সোহাগ আহমেদ। অভিযোগ রয়েছে, নিয়ম মেনে বিএমইটির ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গেলেও তিনি শেষ পর্যন্ত ওই সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ডেই আটকা পড়ে প্রাণ হারান।

আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক বাধা

এই মানবিক সংকটের সবচেয়ে জটিল দিক হলো আইনগত বিভ্রান্তি। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী চক্রের সদস্য ও পাচারের শিকার ভুক্তভোগী—উভয়কেই এক পাল্লায় মাপা হচ্ছে।

•ভিসা জরিমানা মওকুফ: কম্বোডিয়া সরকার ১ সেপ্টেম্বর থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ভিসায় অবস্থানরত বিদেশিদের জরিমানা ছাড়াই স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার সুযোগ দিয়েছে। তবে ৩১ অক্টোবরের ডেডলাইনের শর্ত, যোগ্যতার মানদণ্ড এবং জরিমানা মওকুফের প্রকৃত নিয়ম নিয়ে স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে।

•স্থগিত যাচাই প্রক্রিয়া: কোনো প্রবাসী পাচারের শিকার নাকি অপরাধ চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তা নির্ধারণে কম্বোডিয়ান কর্তৃপক্ষ একটি সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া চালু করেছিল। ভুক্তভোগী প্রমাণিতদের দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হলেও বর্তমানে এই যাচাই প্রক্রিয়াটি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। ফলে প্রক্রিয়াটি পুনরায় চালু করার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ মিশন।

•বিমানবন্দরে আটক: গত ৩ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরার সময় ফনম পেন বিমানবন্দরে অনিয়মিত অভিবাসন জটিলতাসহ নানা কারণে ৩২ জন বাংলাদেশিকে আটক করা হয়। এর মধ্যে দুজন আগেই মুক্তি পান; বাকি ৩০ জন দীর্ঘ কূটনৈতিক তৎপরতার পর শুক্রবার সন্ধ্যায় ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টার থেকে মুক্তি পান। তাঁদের নিজ খরচে টিকিট কেটে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দেশে ফেরার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

পরিবারের কাঁধে ঋণের পাহাড়

কম্বোডিয়ায় আটকে থাকা এই প্রবাসীদের সংকটের প্রভাব পড়েছে তাঁদের পরিবারগুলোতেও। মানিকগঞ্জের সিংগাইরের মোহাম্মদ সেন্টু সাড়ে তিন বছর ধরে সেখানে আটকে আছেন। একাধিকবার ফ্লাইটের টিকিট কেটে প্রতারিত হয়ে এখন নিঃস্ব তিনি। বর্তমানে খাবারের বিনিময়ে অন্য বাংলাদেশিদের রান্নার কাজ করে দিন কাটাচ্ছেন।

একই অভিজ্ঞতা পাবনার কবির হোসেনের। তাঁর ২৪ বছর বয়সী ছেলে শাওন মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনের কম্পিউটার-সংক্রান্ত চাকরির প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রায় দেড় বছর আগে কম্বোডিয়ায় যান। যাত্রার জন্য নেওয়া ৬ লাখ টাকার ঋণের বোঝা তো আছেই, উল্টো ছেলের খাওয়া-পড়ার খরচও পাঠাতে হচ্ছে দেশ থেকে। সব মিলিয়ে কবির হোসেনের খরচ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ লাখ টাকায়, তবুও ছেলেকে ফেরানো যায়নি।

নজরদারি ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরীফুল হাসান প্রশ্ন তুলেছেন প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি নিয়ে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রায় ১৬ হাজার মানুষকে বিএমইটি ছাড়পত্র দিয়ে পাঠানোর পর তাঁদের কর্মক্ষেত্র, কাজের পরিবেশ বা নিরাপত্তা নিয়ে তদারকির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। সরকারি প্রক্রিয়ায় গিয়েও যদি নাগরিকেরা পাচারচক্রের শিকার হন, তবে এই ছাড়পত্র ব্যবস্থার ওপরই প্রশ্ন ওঠে।

দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি

অনির্বাণ ফাউন্ডেশন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রীর কাছে পাঁচ দফা দাবি সংবলিত স্মারকলিপি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে, যার অনুলিপি পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হবে। তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো:

•জরুরি ভিত্তিতে আটকে পড়া সব প্রবাসীকে দেশে ফিরিয়ে আনা।

•প্রকৃত ভুক্তভোগীদের চিহ্নিত করতে নিরপেক্ষ ব্যক্তিগত যাচাইকরণ।

•জবরদস্তির মুখে সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

•ফিরে আসা অভিবাসীদের সামাজিক ও আর্থিক পুনর্বাসন।

•আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের স্থানীয় ও বিদেশি এজেন্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা।

সময় বয়ে যাচ্ছে

৩১ অক্টোবরের সময়সীমা শেষ হতে আর হাতে গোনা কয়েক দিন বাকি। এর মধ্যে কতজন নিরাপদে দেশে ফিরতে পারবেন—তা এখনো নিশ্চিত নয়। এই মুহূর্তে ভিসা মওকুফের শর্ত পরিষ্কার করা, আটকে থাকা যাচাইকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত চালু করা এবং অর্থসংকটে থাকা প্রবাসীদের টিকিটের ব্যবস্থা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp