পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নিয়ে বেইজিংয়ের কড়া বার্তা

পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি নিয়ে বেইজিংয়ের কড়া বার্তা
মধ্যপ্রাচ্যে চীন-যুক্তরাষ্ট্র ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের স্পর্শকাতর ভূ-রাজনীতিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দিয়ে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতি সম্প্রসারণ নীতির কঠোর সমালোচনা করেছে চীন। সরাসরি ইসরায়েলি রাষ্ট্রপ্রধানকে মুখোমুখি করে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পশ্চিম তীরে যেকোনো ধরনের “জোরপূর্বক বসতি স্থাপন” বন্ধ করে তা প্রত্যাহার করা উচিত। বিশ্ব পরাশক্তি হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের সমান্তরালে চীনের এই অবস্থান কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন বার্তা দিচ্ছে।

বাকু সম্মেলন: ঠিক কী ঘটেছিল শীর্ষ বৈঠকে

আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত ‘এশিয়ায় পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বিষয়ক সম্মেলন’-এর (CICA) সপ্তম শীর্ষ বৈঠকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। সম্মেলনের ফাঁকে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তিনি এ কড়া বার্তা দেন।

বৈঠকে ওয়াং ই ফিলিস্তিন সংকটকে “এই শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক অবিচার” বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে বেইজিংয়ের মধ্যপ্রাচ্য নীতির মূল স্তম্ভ হিসেবে কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন:
•দ্বিরাষ্ট্র সমাধান ও শান্তি: অঞ্চলে টেকসই স্থিতিশীলতা ফেরাতে ‘দ্বিরাষ্ট্র সমাধান’-ই সঠিক পথ।
•মানবিক প্রবেশাধিকার: গাজায় দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর জন্য প্রবেশপথ সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া, যাতে মানবিক বিপর্যয় আরও গভীর না হয়।
•রাজনৈতিক আলোচনা: সব পক্ষকে দ্রুত আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে এনে টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট: ইসরায়েলের ওপর বহুমাত্রিক চাপ

১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে পশ্চিম তীর দখলে রাখা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চাপ দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ হিসেবে গণ্য হলেও বর্তমানে পশ্চিম তীরে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করছে। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কট্টরপন্থীদের সমর্থন ধরে রাখতে নেতানিয়াহু সরকার যখন বসতি সম্প্রসারণ জোরদার করছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক বিরোধিতা তীব্রতর হচ্ছে।

আয়ারল্যান্ড, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে ও বেলজিয়াম আগেই বসতি থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বা তা কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এদের মধ্যে নরওয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়; তবে ইউরোপীয় রাষ্ট্র হিসেবে একই ধারার নীতি গ্রহণ করেছে।
সম্প্রতি ব্রিটেন, ফ্রান্স ও কানাডা যৌথভাবে ঘোষণা দিয়েছে যে তারা পশ্চিম তীরের ইসরায়েলি বসতি থেকে আমদানিকৃত পণ্যের বাণিজ্য নিষিদ্ধ করবে এবং বসতি সম্প্রসারণে জড়িত কিছু সেবা—যেমন অর্থায়ন, নির্মাণ, অবকাঠামো, রিয়েল এস্টেট ও বিজ্ঞাপন—নিষিদ্ধ করার পদক্ষেপ নেবে। এটি সমগ্র ইসরায়েলের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের সিদ্ধান্ত নয়; বসতিভিত্তিক পণ্য ও সেবার ওপরই সীমাবদ্ধ।
এই পদক্ষেপের জবাবে প্রেসিডেন্ট হারজগ ব্রিটিশ ব্যবস্থাকে “গুরুতর ভুল” বলে অভিহিত করেন এবং একে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেন।

মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বিকাশ ও মার্কিন-চীন মেরুকরণ

বিশ্ব রাজনীতির বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই কড়া অবস্থান কেবল ফিলিস্তিনকেন্দ্রিক নয়; এর পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের কৌশলগত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি।
১. বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক শক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে চীনের প্রধান শক্তি তাদের অর্থনৈতিক উপস্থিতি। সৌদি আরব ও ইরান—উভয় দেশের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারই চীন। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জেফ্রি ফেল্টম্যানের বরাতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু অংশে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।
২. সৌদি-ইরান চুক্তি ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা: ২০২৩ সালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে মধ্যস্থতা করে চীন বিশ্বে বড় ধরনের বার্তা দেয়। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ও স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই চুক্তিতে ওমানের পরোক্ষ অবদান থাকলেও বেইজিং মূল “সহায়তাকারী” (Facilitator) হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশাল মর্যাদা লাভ করেছে।
৩. ভারসাম্যের কূটনীতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা: ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রতার কারণে ওয়াশিংটনকে গ্লোবাল সাউথ বা মুসলিম বিশ্বের কাছে সবসময় নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী মনে করা হয়নি। এই কূটনৈতিক সুযোগটিই নিচ্ছে বেইজিং। ইরানের সঙ্গে ২০২১ সালে স্বাক্ষরিত ২৫ বছর মেয়াদি ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ চুক্তি রক্ষা করেও বেইজিং কূটনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত রেখেছে।
৪. বহুমাত্রিক মেরুকরণ: সাবেক মার্কিন কূটনীতিকদের মতে, রিয়াদের মতো ঐতিহ্যবাহী মার্কিন মিত্র দেশগুলো এখন একক কোনো পরাশক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজেদের নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের ঝুঁকি ছড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্য এখন দ্বিমুখী সংঘাতের বদলে বহুমুখী ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

বেইজিংয়ের সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতা

কূটনৈতিক বার্তা হিসেবে চীনের বক্তব্য শক্তিশালী হলেও বাস্তবে ইসরায়েলি পদক্ষেপ থামানোর মতো চাপ প্রয়োগের প্রত্যক্ষ হাতিয়ার বেইজিংয়ের হাতে সীমিত। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তায় সামরিক ও প্রতিরক্ষা ছাতা হিসেবে এখনো যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ।

তবে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র প্রভাবে ফাটল ধরিয়ে কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীনা প্রভাব যে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে—বাকুর এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠক তারই এক স্পষ্ট উদাহরণ
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp