ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশে পাড়ি দেওয়া অসচ্ছল তরুণেরা আজ আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সংঘাতের নৃশংসতম শিকার হচ্ছেন। উন্নত জীবন ও উচ্চ বেতনের মিথ্যা আশ্বাসে বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়ায় নিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে সরাসরি ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে এই মানবপাচার চক্রের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। তবে নিখোঁজ কিংবা প্রাণ হারানো বাংলাদেশিদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে এখনও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
সংঘাতের মুখে প্রবাসীরা: হতাহতের প্রকৃত চিত্র কতদূর?
ব্যাংককভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস ও ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডসের যৌথ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ‘আই ওয়াজ ট্রিকড ইনটু দ্য ওয়ার’-এ বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশিকে রুশ সামরিক বাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছে; এর মধ্যে অন্তত ৩৪ জনের যুদ্ধে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
অপরদিকে, বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একজন কর্মকর্তা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেছেন, প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশি এই যুদ্ধে প্রাণ হারিয়ে থাকতে পারেন। তবে এটি প্রাথমিক হিসাবভিত্তিক আশঙ্কা; নিশ্চিত মৃত্যুর সরকারি তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি।
নিহত বা নিখোঁজদের এই পরিসংখ্যানে সামঞ্জস্য না থাকাটাই প্রমাণ করে—ঠিক কতজন তরুণ এই পাচার চক্রের শিকার হয়ে রাশিয়ায় গিয়েছেন এবং যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন, তার কোনো একক ও নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার এখনও নেই।
কীভাবে সক্রিয় এই আন্তর্জাতিক পাচার চক্র?
মানবপাচারকারীরা কেবল সাধারণ প্রতারণা চালাচ্ছে না; বরং পরিকল্পিতভাবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র ও কর্মহীন যুবকদের নিশানা করছে। চক্রটির কাজের ধরন মূলত চারটি ধাপে বিভক্ত:
১. আকর্ষণীয় বেতনের টোপ: দালালরা নিম্নআয়ের পরিবারের তরুণদের নিশানা করে। তাদের নির্মাণ কোম্পানিতে কাজ, রুশ সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে বাবুর্চি, ক্লিনার বা লজিস্টিক সহায়তার মতো বেসামরিক কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। মাসে ২ থেকে ২.৫ লাখ টাকা বেতনের কথা বলে আগ্রহ তৈরি করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য দেশে পাঠানোর নাম করে পরবর্তীতে তাদের রাশিয়ায় নেওয়া হয়।
২. নজরদারি এড়াতে কৌশল পরিবর্তন: সরাসরি সামরিক কাজের কথা গোপন রেখে ভিসার ধরন ও যাত্রাপথ ঘনঘন পরিবর্তন করা হয়। পর্যটন বা ভিজিট ভিসার আড়ালে কর্মীদের বিদেশে পাঠিয়ে পরবর্তীতে কৌশলে মস্কো পৌঁছানো হয়, যাতে বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সন্দেহ না জাগে।
৩. রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর জিম্মি ও চুক্তি স্বাক্ষর: মস্কো পৌঁছানোর পরপরই চক্রের স্থানীয় সদস্যরা কর্মীদের পাসপোর্ট ও মোবাইলফোন কেড়ে নেয়। তাদের রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিতে সই করতে বাধ্য করা হয়। এরপর মাত্র ২১ দিনের সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের ইউক্রেনের সম্মুখসমরে পাঠানো হয়।
৪. অর্থের লেনদেন ও মানব বিক্রি: একেকজন তরুণকে রাশিয়া পাঠাতে প্রায় ৮ হাজার মার্কিন ডলার—দেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ থেকে ৯ লাখ টাকা—আদায় করে দালালরা। অভিযোগ রয়েছে, রাশিয়া পৌঁছানোর পর তাদের রুশ বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এটি এলোমেলো জালিয়াতি নয়, বরং আন্তর্জাতিক স্তরের সংগঠিত মানবপাচারের লক্ষণ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ ও আইনি সীমাবদ্ধতা
সাম্প্রতিক অভিযানে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)—যার পূর্বনাম র্যাব—মানবপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তাররা হলেন জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের ওরফে লেন্টু। এসআরবি বলছে, ওই চক্রের মাধ্যমে অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল, যাদের মধ্যে ২০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিআইডি ‘ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেড’-এর অংশীদার ফাবিহা জেরিন তামান্নাকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে উচ্চ বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাংলাদেশিদের রাশিয়ায় পাচার ও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ আনা হয়।
একইসঙ্গে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল এবং টিএস গ্রুপ—এই তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অন্তত ৩০ জনকে রাশিয়ায় পাঠানোর বিষয়টি এসআরবির তদন্তে উঠে এসেছে।
সরকারি ও গবেষণা তথ্য বলছে, এই পাচারের পরিধি দ্রুত বাড়ছে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (আরএমএমআরইউ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ৯৯৩ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় গিয়েছিলেন; পরের বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪,৬৬৩ জনে। ভিসা যাচাই ও অভিবাসন নজরদারির দুর্বলতাই পাচারকারীদের সুযোগ দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাশিয়া কেন বিদেশি যোদ্ধাদের ওপর নির্ভরশীল?
দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক সেনা হারিয়েছে রাশিয়া। দেশের অভ্যন্তরে নতুন করে বাধ্যতামূলক সেনা সংগ্রহ ঘোষণা করলে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকায় মস্কো বিদেশি চুক্তিবদ্ধ সেনা নিয়োগের ওপর বেশি নির্ভর করছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ২৮ হাজারের বেশি বিদেশি নাগরিক রুশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে এবং অন্তত ৫,১৪৯ জন বিদেশি যোদ্ধা যুদ্ধে নিহত হয়েছে। তবে যুদ্ধরত কোনো পক্ষই বিদেশি সেনাদের সম্পূর্ণ ও নির্ভুল তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে না।
বাস্তবতা হলো, দারিদ্র্য, ঋণ ও কর্মসংস্থানের চাপে থাকা তরুণরাই এই সংকটের প্রধান বলির পাঁঠা হচ্ছেন।
প্রবাসগামীদের জন্য জরুরি সতর্কতা
বিদেশে কর্মসংস্থানের খোঁজে থাকা তরুণ ও তাদের পরিবারের জন্য কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি:
•লাইসেন্স যাচাই: জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) নিবন্ধিত তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সি ছাড়া অন্য কারও মাধ্যমে লেনদেন করবেন না।
•ভিসার ধরন নিশ্চিতকরণ: ট্যুরিস্ট বা ভিজিট ভিসায় বিদেশে গিয়ে কাজের চুক্তিতে জড়ানো ঝুঁকিপূর্ণ।
যাত্রাপথ পরিবর্তন হলে সতর্কতা: চুক্তির গন্তব্যের বদলে অন্য দেশ হয়ে নিয়ে যেতে চাইলে অবিলম্বে যাত্রা স্থগিত করুন।
•ব্যাংক লেনদেন: বৈধ কাজের চুক্তিপত্র ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতে পাওয়ার আগে কোনো দালাল বা সংস্থাকে বড় অঙ্কের নগদ টাকা দেবেন না।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু সামান্য বেতনের লোভে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ বিসর্জন কোনোভাবেই কাম্য নয়। পাচারকারী চক্রের মূলোৎপাটনের পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থান যাচাইকরণে সরকারের অভিবাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনাই এখন সময়ের দাবি।