বিশ্ব অর্থব্যবস্থায় নতুন বার্তা
বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কমপ্লায়েন্স এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের প্রয়োগ কতটা কঠোর হতে পারে, তার এক বিরল নজির স্থাপন করল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ (Anti-Money Laundering) ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মারাত্মক ব্যর্থতার দায়ে দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ব্যাংক অব আমেরিকার ওপর ১.২১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি জরিমানা আরোপ করেছে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়।
উচ্চপর্যায়ের এই তদারকি ও আইনি ব্যবস্থা বিশ্ব আর্থিক অঙ্গনে বড় ধরনের নাড়া দিয়েছে। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, প্রশাসনিক শিথিলতা ও নিয়ম লঙ্ঘনের দায়ে এটি মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে তৃতীয় বৃহত্তম জরিমানা; এর আগে ২০২৩ সালে বিনান্সকে ৩.৪ বিলিয়ন এবং ২০২৪ সালে টিডি ব্যাংককে ১.৩ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছিল।
ঘটনাপঞ্জি ও জরিমানার বিন্যাস
মার্কিন অর্থমন্ত্রণালয়ের আওতাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যৌথভাবে এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে:
১. ফিনক্যান (FinCEN) ও ওসিসি (OCC): ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক বা ফিনক্যান ব্যাংকটির বিরুদ্ধে ১.২ বিলিয়ন ডলার জরিমানা নির্ধারণ করেছে। এই ১.২ বিলিয়ন ডলারের মধ্যেই ইউএস অফিস অব দ্য কম্পট্রোলার অব দ্য কারেন্সি (OCC) আরোপিত ৭৫ কোটি ডলার ক্রেডিট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে; যা ওসিসির ইতিহাসে কোনো একক ব্যাংকের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ অঙ্কের জরিমানা। মূলত চীনা মানিলন্ডারিং নেটওয়ার্ক এবং মার্কিন দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তঘেঁষা অবৈধ অর্থপ্রবাহ শনাক্ত ও প্রতিবেদনে ব্যর্থতার কারণে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
২. ওফাক (OFAC): একই সঙ্গে বৈদেশিক সম্পদ নিয়ন্ত্রণ দপ্তর বা ওফাকের জারি করা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের অভিযোগে ব্যাংকটি পৃথকভাবে ১ কোটি ১৬ লাখ ডলার জরিমানা প্রদানে সম্মত হয়েছে। ওফাকের বিরুদ্ধে অভিযোগে ৪৭৫টি সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের কথা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ব্যাংকটিকে মোট ১.২১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি শাস্তিমূলক অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
কাঠামোগত দুর্বলতা ও ব্যাংক অব আমেরিকার ব্যর্থতা
মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তদন্তে উঠে এসেছে, ব্যাংক অব আমেরিকা ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি মূল্যের সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য সময়মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিনক্যানকে জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১০০ কোটি ডলারের লেনদেন জাতীয় নিরাপত্তা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অবৈধ অর্থায়নের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল; যার মধ্যে চীনা মানিলন্ডারিং নেটওয়ার্ক, জালিয়াতি এবং দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তসংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য বাণিজ্যভিত্তিক অর্থ পাচারের (Trade-Based Money Laundering) লক্ষণ ছিল।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যাংক অব আমেরিকা স্বীকার করেছে যে তারা ইচ্ছাকৃতভাবে ১৯৭০ সালের ব্যাংক সিক্রেসি অ্যাক্ট (Bank Secrecy Act) লঙ্ঘন করেছে এবং একটি কার্যকর মানিলন্ডারিং বিরোধী কাঠামো বজায় রাখতে, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের করেসপন্ডেন্ট হিসাবের যথাযথ যাচাই করতে এবং সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এমনকি ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ওসিসি কর্তৃক জারি করা একটি সিজ-অ্যান্ড-ডিজিস্ট (Cease-and-Desist) নির্দেশনার পরও ব্যাংকটি তাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠনে পর্যাপ্ত অগ্রাধিকার দেয়নি বলে নিয়ন্ত্রকদের অভিযোগ।
প্রতিক্রিয়ায় ব্যাংক অব আমেরিকা জানিয়েছে, তারা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এই নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া নিশ্চিত করছে এবং কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা সংস্কারে কাজ করছে।
কঠোর নজরদারির নতুন বার্তা
এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এর পাঁচ দিনেরও কম সময় আগে, অর্থাৎ ৮ অক্টোবর, কমপ্লায়েন্স সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে আমেরিকান এক্সপ্রেস ন্যাশনাল ব্যাংককে ৩৫ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়েছিল।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, এই নিষ্পত্তি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে আকার বা প্রভাব যত বড়ই হোক, কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানই দেশের আইন ও জাতীয় নিরাপত্তার ঊর্ধ্বে নয়।
বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাত ও অর্থনৈতিক প্রভাব
আইনি বাধ্যবাধকতা: ব্যাংক সিক্রেসি অ্যাক্ট অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করে ফিনক্যানের কাছে সাসপিশাস অ্যাক্টিভিটি রিপোর্ট জমা দিতে হয়। এর ব্যত্যয় ঘটলে বিশাল জরিমানা ছাড়াও আইনি ও নিয়ন্ত্রক ঝুঁকি তৈরি হয়।
•আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক চাপ: জরিমানা পরিশোধের পাশাপাশি ব্যাংকের কমপ্লায়েন্স প্রযুক্তি, ফরেনসিক অডিট, তদারকি ব্যবস্থা ও জনবলে বড় বিনিয়োগ করতে হয়। এতে পরিচালন মুনাফা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর চাপ পড়ে।
•বৈশ্বিক ব্যাংকিংয়ে ডি-রিস্কিং: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারভিত্তিক লেনদেন থাকায় মার্কিন আইনের প্রভাব বিশ্বজুড়ে অনুভূত হয়। এ ধরনের শাস্তির পর বৈশ্বিক ব্যাংকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল বা গ্রাহকের সঙ্গে লেনদেন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেয় (De-risking)। ফলে উন্নয়নশীল দেশের স্থানীয় ব্যাংক ও আমদানিকারক-রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও এলসি খোলা আরও ব্যয়বহুল ও জটিল হতে পারে।
ব্যাংক অব আমেরিকার ওপর আরোপিত এই বিশাল জরিমানা বিশ্বজুড়ে পরিচালিত আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এক বড় সতর্কবার্তা। বাণিজ্যিক মুনাফাকে কমপ্লায়েন্স বা আইনি কাঠামোর ওপর স্থান দেওয়ার সুযোগ যে দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে, মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই কঠোর অবস্থান তারই স্পষ্ট প্রমাণ।