বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে যুক্ত হলো এক নতুন মাত্রা। ১০ অক্টোবর চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট (এক্সিম) ব্যাংকের সঙ্গে মংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের লক্ষ্যে ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন ডলারের—২.৪০৪ বিলিয়ন ইউয়ান বা প্রায় ৩ হাজার ৫৯২ কোটি ৯০ লাখ টাকার—ঋণচুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) যুগ্মসচিব আলিয়া মেহের এবং চীনের পক্ষে এক্সিম ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফেংজুন তিয়ান নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। সংবাদটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর থেকেই ঢাকা, বেইজিং ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক অঙ্গনে এটি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে।
দীর্ঘ বিলম্বের পর কেন এখন চুক্তি
প্রকল্পটি হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। ২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরের সময় ২৭টি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পের তালিকা তৈরি হয়েছিল; মংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন ছিল তার অন্যতম। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতা ও বেইজিংয়ের অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকায় প্রকল্পটি গতি পায়নি।
২০২৫ সালের এপ্রিলের শেষে ইআরডি চীনের কাছে ঋণের আবেদন পাঠায়। কিন্তু দীর্ঘদিন ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ার পর শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ের কূটনৈতিক পদক্ষেপে অচলাবস্থা কাটে। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের সময় দুই দেশ যৌথভাবে মংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার সম্মতি দেয়। এর ধারাবাহিকতায় ঋণচুক্তিটি সই হলো।
এটিকে নতুন সরকারের শুরুর দিকের অন্যতম বড় পররাষ্ট্র-অর্থনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে চুক্তির প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে সময়মতো বাস্তবায়ন ও বন্দরের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর।
ঋণের শর্ত ও বাণিজ্যিক লক্ষ্য
বৈদেশিক ঋণের সাম্প্রতিক কাঠামোর বিচারে এই চুক্তির শর্ত তুলনামূলকভাবে শিথিল:
•সুদের হার: ২ শতাংশ রেয়াতি সুদ।
•পরিশোধের সময়সীমা: পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ মোট ২০ বছর।
প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। এরপর ২৫ মার্চ মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশনের (সিসিইসিসি) মধ্যে বাস্তবায়ন চুক্তি সই হয়।
এই ব্যয়ে বন্দরে নির্মিত হবে:
১. আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল।
২. মোট ৩৬৮ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি কনটেইনার জেটি।
৩. লোডেড কনটেইনার ইয়ার্ড, এম্পটি কনটেইনার ইয়ার্ড, কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড ও বিপজ্জনক পণ্য ব্যবস্থাপনার ইয়ার্ড।
৪. গ্যান্ট্রি ক্রেন, রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অটোমেটেড পরিচালন ব্যবস্থা।
নতুন দুটি জেটি চালু হলে মংলা বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বছরে প্রায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার টিইইউ (TEU) বাড়বে। এতে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন গতি আসবে এবং মংলা বন্দরের আঞ্চলিক গুরুত্বও বাড়তে পারে।
ভারতের উদ্বেগ ও কৌশলগত বার্তা
ভারতীয় গণমাধ্যমে চুক্তিটি কিছুটা উদ্বেগের সঙ্গে স্থান পেয়েছে। ভারতীয় সীমান্ত থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে চীনা অর্থায়নকে নয়াদিল্লি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) মনে করিয়ে দিয়েছে, এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মংলা বন্দরের কাছে প্রস্তাবিত ভারতীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প বাতিল করেছিল। ফলে সাম্প্রতিক চুক্তিকে অনেকে অঞ্চলটিতে ভারতের প্রভাব কমে যাওয়ার আলামত হিসেবে দেখছেন।
তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ একপাক্ষিক নয়। মংলা বন্দর উন্নয়নে ভারতের এক্সিম ব্যাংকের প্রায় ৪.৪৬ বিলিয়ন টাকা বা প্রায় ৫৩০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তার কথা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু সেই ভারতীয় ঋণনির্ভর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শুরু হয়নি এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা বিকল্প অর্থায়ন খুঁজছিল।
ফলে একই বন্দরকে কেন্দ্র করে চীনের নতুন ঋণচুক্তি ঢাকার কূটনৈতিক নমনীয়তা ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যের নীতিকেই নির্দেশ করছে। তবে এটি অবশ্যই নয়াদিল্লির কাছে একটি কৌশলগত সংকেত হিসেবেও গৃহীত হবে।
বড় প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ পরীক্ষা
বঙ্গোপসাগরের বাণিজ্যরুট ও উপকূলীয় সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগ দিন দিন বাড়ছে। আঞ্চলিক ক্ষমতার সমীকরণে বাংলাদেশকে তাই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পা ফেলতে হচ্ছে।
চুক্তি সই হলেও আসল পরীক্ষা এখন সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নে। নজরে রাখতে হবে কয়েকটি মূল সূচক:
•বাস্তবায়নে বিলম্ব রোধ: দীর্ঘ অপেক্ষার পর আবার বিলম্ব হলে প্রকল্পের ব্যয় বাড়তে পারে।
•পশুর চ্যানেলের নাব্যতা: পলি জমে নাব্যতা কমলে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করলেও বড় জাহাজ নোঙর করানো কঠিন হবে। তাই নিয়মিত ড্রেজিং জরুরি।
•পর্যাপ্ত কনটেইনার আগমন: টার্মিনালের অতিরিক্ত সক্ষমতা তখনই অর্থবহ হবে, যখন আঞ্চলিক বাণিজ্যের পর্যাপ্ত জাহাজ ও কার্গো মংলামুখী করা যাবে।
•পরিশোধের সামর্থ্য: গ্রেস পিরিয়ডের পর ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ সামলাতে বন্দর থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, মংলা বন্দরের ভূরাজনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক সফলতা নির্ভর করবে টার্মিনালে শেষ পর্যন্ত কতটা পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়ছে তার ওপর—অর্থায়নের উৎস যে দেশই হোক না কেন।