মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ প্রবাসীদের দরজায়

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তাপ প্রবাসীদের দরজায়
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা কেন ঢাকার জন্য সতর্কবার্তা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংঘাত এত দিন বাংলাদেশের মানুষের কাছে ছিল টেলিভিশনের সংবাদ কিংবা পত্রিকার পাতার বিশ্লেষণ। কিন্তু গত ১০ অক্টোবর রিয়াদে ঘটে যাওয়া রক্তক্ষয়ী হামলা সেই দূরত্ব মুছে দিয়ে সংঘাতকে নিয়ে এসেছে প্রবাসীদের একেবারে ঘরের দরজায়। মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ও বিমানবন্দরগুলো যখন নতুন করে সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে, তখন কেবল অর্থনীতি নয়—প্রবাসী শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তাও ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।

কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলা: ঠিক কী ঘটেছিল

সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১০ অক্টোবরের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি ছিলেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ ও কয়েকটি সংবাদমাধ্যম হামলার জন্য হুতিদের দায়ী করেছে; তবে হামলার পরপরই হুতিরা এর দায় স্বীকার করেনি।
এক সপ্তাহের মধ্যে বিমানবন্দরটিতে এটি ছিল তৃতীয় হামলা এবং প্রাণহানির দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ। আগের হামলাগুলোতেও বিমানবন্দর ও একটি সৌদি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয়।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, হামলায় আহত চার বাংলাদেশি রিয়াদের একটি হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ছিলেন। কর্মসংস্থান বা ছুটির কারণে বিমানবন্দরে থাকা সাধারণ যাত্রী ও কর্মীরাই হামলার ঝুঁকিতে পড়েছেন।

হুতি-সৌদি সংঘাতের নতুন কৌশল

সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে ২০২২ সালে হওয়া যুদ্ধবিরতি ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভেঙে পড়ে। এরপর ইয়েমেনের সংঘাত নতুন করে তীব্র হয় এবং সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা বাড়ে। হামলাগুলোর পেছনে হুতিদের উদ্দেশ্য বা নির্দিষ্ট কৌশল সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন; তবে বিমানবন্দর ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বিমান চলাচল—দুই ক্ষেত্রেই গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
বেসামরিক বিমানবন্দরকে লক্ষ্যবস্তু করা হলে:
সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়।
আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক ভাবমূর্তির ওপর চাপ পড়ে।
বিমানবন্দরে যাতায়াতকারী বিদেশি শ্রমিক ও যাত্রীদের জীবন সরাসরি ঝুঁকিতে পড়ে।

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে প্রবাসীদের নিরাপত্তা

সামরিক বা রাজনৈতিক সংঘাতের পক্ষ না হয়েও প্রবাসী কর্মীরা ভৌগোলিক কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আটকা পড়তে পারেন। নির্মাণ, পরিবহন, বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট কাজ ও শিল্পাঞ্চলে কর্মরত শ্রমিকদের জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে বাংলাদেশিরা সংঘাতজনিত হামলার শিকার হয়েছেন। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় চার বাংলাদেশি আহত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে; একই হামলায় অন্তত একজন নিহত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। লেবাননে ২০২৬ সালের মে মাসে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত হন।
পৃথক ঘটনাগুলো দেখায়, সংঘাতপ্রবণ এলাকায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর প্রস্তুতি দরকার।

বিমান চলাচল ও রেমিট্যান্সের সম্ভাব্য চাপ

হামলার পর রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ঢাকা-রিয়াদসহ বিভিন্ন রুটের ফ্লাইট বাতিল হয়। বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত আটটি ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় ২,৯৫১ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হন। ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্যেও রিয়াদগামী ও রিয়াদ থেকে ছেড়ে যাওয়া বহু ফ্লাইট বাতিলের খবর এসেছে; তবে মোট বাতিল বা পুনর্নির্ধারিত ফ্লাইটের সংখ্যা সময় ও তথ্যসূত্রভেদে ভিন্ন।
বিমান চলাচল দীর্ঘদিন অনিশ্চিত থাকলে নতুন কর্মী নিয়োগ, কর্মীদের কর্মস্থলে ফেরা এবং ছুটিতে দেশে আসা-যাওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের অর্থনীতিতেও:
•রেমিট্যান্সে সৌদি আরবের ভূমিকা: বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৫.৮৫ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশের মোট ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সের এটি প্রায় ১৬.৩ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ।
•চলতি অর্থবছরের প্রবাহ: ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে, জুলাই–সেপ্টেম্বরে, বাংলাদেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৮.৫৯ বিলিয়ন ডলার—আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩.৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ১.৬৫ বিলিয়ন ডলার। এই পরিসংখ্যান সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব দেখায় না; অস্থিরতা স্থায়ী হলে পরবর্তী মাসগুলোতে প্রভাব পড়তে পারে।

‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’: সুযোগ নাকি ঝুঁকি?

সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির ঘোষিত নীতি অনুযায়ী, কোনো এক সদস্যরাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র হামলাকে অন্য সদস্যদের ওপর হামলা হিসেবেও বিবেচনা করা হবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তিটিকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।
চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি:
১. চুক্তির শর্ত: সম্মিলিত প্রতিরক্ষা কীভাবে কার্যকর হবে, তার পূর্ণাঙ্গ শর্ত জনসমক্ষে কতটা স্পষ্ট—তা যাচাই করা দরকার।
২. আঞ্চলিক ভারসাম্য: পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে একই সামরিক কাঠামোয় যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের আঞ্চলিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
৩. প্রবাসীদের নিরাপত্তা: সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। কৌশলগত অংশীদারত্ব তাদের নিরাপত্তায় সহায়ক হতে পারে; আবার সামরিক জোটে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সংঘাতের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত করবে কি না, তা সতর্কভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সরকারের করণীয়

১. জরুরি সুরক্ষা ও উচ্ছেদ পরিকল্পনা: সংঘাতপ্রবণ এলাকায় থাকা প্রবাসীদের জন্য দূতাবাসের সার্বক্ষণিক হটলাইন, জরুরি আশ্রয় এবং প্রয়োজনে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখা।

২. সহায়তা, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন: নিহতদের মরদেহ দেশে আনা এবং আহত ব্যক্তি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য দ্রুত আর্থিক সহায়তা, চিকিৎসা ও বীমার ব্যবস্থা করা।

৩. বিকল্প বিমানপথ: আকাশসীমা ঝুঁকিপূর্ণ হলে যাত্রী পরিবহন সচল রাখতে বিকল্প ট্রানজিট ও রুটের প্রস্তুতি রাখা।

৪. জাতীয় আলোচনা: নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অংশ নেওয়ার আগে সংসদ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্বচ্ছ আলোচনা করা।

জাতীয় অর্থনীতির হিসাবে রেমিট্যান্স একটি পরিসংখ্যান; কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একজন প্রবাসী শ্রমিকের শ্রম, ত্যাগ এবং পরিবারের জীবিকা। পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রবাসীদের জীবন ও মৌলিক নিরাপত্তা অগ্রাধিকার না পেলে সেই কূটনীতি পূর্ণতা পায় না!
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp