২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের মধ্য দিয়ে ইউরোপের বুকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ সশস্ত্র সংঘাতের সূচনা ঘটে। চার বছরেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে যুদ্ধটি এখন পঞ্চম শীতে পদার্পণ করছে। সম্মুখ সমরের রক্তক্ষয়ী লড়াই প্রায় অচলাবস্থায় আটকে থাকলেও, আকাশপথের হামলা, জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংসের প্রতিযোগিতা এবং পরিবর্তনশীল ভূ-রাজনীতি এই সংঘাতকে নতুন এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আকাশপথে হামলা ও বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা
সম্প্রতি উভয় পক্ষের আকাশপথের আক্রমণ ও প্রতি-আক্রমণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউক্রেনীয় বিমান বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ৭ অক্টোবরের রাতে রাশিয়া ইউক্রেনজুড়ে অন্তত ১৩০টি আক্রমণকারী ও বিভ্রান্তিকর ড্রোন, ৪৮টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং একাধিক ব্যালিস্টিক ও জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দেয়। হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল কিয়েভ, খারকিভ, পোলতাভা ও দনিপ্রোপেত্রোভস্ক অঞ্চল।
এই হামলায় সারা ইউক্রেনে অন্তত ২৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৩০-রও বেশি মানুষ আহত হন। চেরনিহিভ অঞ্চলের প্রিলুকি শহরে একটি আবাসিক ভবনে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ১৪ জন নিহত হন; কিয়েভে নিহত হন দুইজন। নিহতদের মধ্যে শিশুও ছিলেন।
৮ অক্টোবর ইউক্রেন এই হামলার শিকারদের স্মরণে জাতীয় শোকদিবস পালন করে। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের মুখে মস্কো জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্যবস্তু ছিল ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা শিল্প ও সামরিক অবকাঠামো।
কৌশলগত অবকাঠামো ধ্বংস ও ‘জ্বালানি যুদ্ধ’
আসন্ন শীত মৌসুমকে সামনে রেখে রুশ বাহিনী ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রেখেছে। কিয়েভ, দনিপ্রো ও জাপোরিঝিয়াসহ একাধিক অঞ্চলের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সেতু লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হচ্ছে। লক্ষ্য হলো শীতের চরম আবহাওয়ায় ইউক্রেনের বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত করে সাধারণ জনগণ ও যুদ্ধ-অর্থনীতিকে চাপে ফেলা।
প্রতিউত্তরে ইউক্রেনীয় বাহিনী দূরপাল্লার ড্রোন প্রযুক্তির ওপর ভর করে রাশিয়ার অভ্যন্তরে জ্বালানি ও সামরিক অবকাঠামোতে হামলা অব্যাহত রেখেছে। এই ‘অ্যাসিমেট্রিক ওয়ারফেয়ার’ রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ ও যুদ্ধ-অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
ফ্রন্টলাইনের গতিপ্রকৃতি: দোনেৎস্ক ও দক্ষিণাঞ্চল
স্থলযুদ্ধের ময়দানে দৃশ্যমান কোনো বিশাল অগ্রগতি না থাকলেও উভয় পক্ষই রক্তক্ষয়ী লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
•পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্ট: রাশিয়ার প্রধান লক্ষ্য দোনেৎস্ক অঞ্চলের কৌশলগত ‘ফোর্ট্রেস বেল্ট’—বিশেষত স্লোভিয়ানস্ক ও ক্রামাতোর্স্ক—দখলের দিকে এগোনো। তবে সম্প্রতি লিমানের দক্ষিণে কিছু এলাকায় রুশ বাহিনীর অবস্থান দুর্বল হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
•দক্ষিণাঞ্চলীয় ফ্রন্ট: জাপোরিঝিয়া ও ওরিখিভ অঞ্চলে উভয় পক্ষই প্রতিরক্ষা ভেদ ও সীমিত অগ্রগতির চেষ্টা চালাচ্ছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও মধ্যস্থতার জটিলতা
যুদ্ধের ময়দানে স্থবিরতার মাঝেই নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে।
•মার্কিন উদ্যোগ: ইউক্রেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় কর্মকর্তারা ৯–১০ অক্টোবর মিয়ামিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন শান্তি আলোচনায় মিলিত হন। আলোচনায় শীতকালীন জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষা, শস্য রপ্তানি, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ প্রতিরোধের বিষয়গুলো ছিল।
•সম্ভাব্য আলোচনার ধরন: জেলেনস্কি জানিয়েছেন, দলগুলোর পর্যায়ে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক প্রস্তুতির বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে; অক্টোবরের দ্বিতীয়ার্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে কোনো সমঝোতার সম্ভাবনাও আলোচনায় উঠেছে।
•মস্কোর অবস্থান: ক্রেমলিন আবারও নেতাপর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সম্ভাবনা খারিজ করেছে এবং জানিয়েছে, এই মুহূর্তে শান্তি আলোচনার জন্য পর্যাপ্ত ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়নি।
•কৃষ্ণসাগর ও জ্বালানি যুদ্ধবিরতি: আলোচনার একটি সম্ভাব্য বিকল্প হলো কৃষ্ণসাগর জ্বালানি অবকাঠামোকে কেন্দ্র করে সীমিত যুদ্ধবিরতি। মস্কো সম্ভাব্য জ্বালানি যুদ্ধবিরতির সঙ্গে কৃষ্ণসাগরীয় ব্যবস্থাকে যুক্ত করতে চাইছে বলে জানা গেছে।
অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও বিশ্ব রাজনীতি
দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রভাব দুই দেশের অর্থনীতিতেই গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। রাশিয়ার আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস বিক্রির আয় সংকুচিত হওয়ায় দেশটির জ্বালানি রপ্তানি ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তীব্র হয়েছে; সম্প্রতি রুশ ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মার্কিন উদ্যোগও এর অংশ।
অপরদিকে, ইউক্রেন তাদের বাজেট ও প্রতিরক্ষার বড় অংশের জন্য পশ্চিমা সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল, যা পশ্চিমা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে প্রতিনিয়ত দোলাচলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত আজ কেবল দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং আধুনিক আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। আসন্ন পঞ্চম বছরে ইউক্রেনের সাধারণ মানুষ ও সামরিক বাহিনীর জন্য এ যাবতকালের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
মাঠের লড়াই যেখানে কোনো সিদ্ধান্তমূলক পরিণতিতে পৌঁছাতে পারছে না, সেখানে কার্যকর কূটনৈতিক সমাধান ছাড়া এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কোনো দ্রুত সমাপ্তি দৃশ্যমান নয়।