নোবেল ২০২৬

নোবেল ২০২৬
রহস্যের অণু উন্মোচন থেকে নক্ষত্রের বার্তা এবং বিজয়ের আখ্যান

শরতের আগমনী বার্তায় প্রতি অক্টোবরের শুরুতেই বিশ্ববাসীর মনোযোগ স্থির হয় দুটি ইউরোপীয় রাজধানীতে—সুইডেনের স্টকহোম এবং নরওয়ের অসলো। এ বছরও ৫ অক্টোবর থেকে বিশ্ববিজ্ঞানের পরম সম্মাননা 'নোবেল পুরস্কার ২০২৬'-এর আনুষ্ঠানিক বিজয়ীদের নাম প্রকাশ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে চিকিৎসা, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও সাহিত্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ চার শাখায় বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।

চলমান এই ঘোষণার মধ্যে এ বছরের বিজয়ী গবেষকদের বৈপ্লবিক অবদান, শতবর্ষী নোবেল ইতিহাস, কঠোর বাছাই প্রক্রিয়া এবং পুরস্কার ঘিরে গড়ে ওঠা নানা আকর্ষণীয় তথ্যের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ আলোকপাত রইল এই নিবন্ধে।

এক নজরে ২০২৬ সালের নোবেল তালিকা

•চিকিৎসাবিজ্ঞান (৫ অক্টোবর): কার্ল ডাইসারথ (যুক্তরাষ্ট্র), পিটার হেগেমান (জার্মানি) ও গেওর্গ নাগেল (জার্মানি)।

•পদার্থবিজ্ঞান (৬ অক্টোবর): ফ্রান্সিস হালজেন (বেলজিয়ামে জন্ম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র)।

•রসায়ন (৭ অক্টোবর): হেনরি বি. কাগান (ফ্রান্স) ও কেনসো সোয়াই (জাপান)।

•সাহিত্য (৮ অক্টোবর): অ্যান কারসন (কানাডা)।

• শান্তি (৯ অক্টোবর): নাভানেথেম "নাভি" পিল্লে
(দক্ষিণ আফ্রিকা)।

•অর্থনীতি: চূড়ান্ত পর্যালোচনার প্রক্রিয়ায় রয়েছে (১২ অক্টোবর ঘোষণার কথা)।

প্রতিটি বিভাগে বিজয়ী বা বিজয়ী দল যৌথভাবে পুরস্কারের সাথে পাচ্ছেন ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার), একটি করে স্বর্ণপদক ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা সনদ।

চিকিৎসাবিজ্ঞান: আলো দিয়ে মস্তিষ্কের রহস্য উন্মোচন

বিজ্ঞানীদের বহু শতাব্দীর কৌতূহল ছিল—জীবন্ত মস্তিষ্কের কোন কোষটি আমাদের অনুভূতি, মনোযোগ ও স্মৃতি নিয়ন্ত্রণ করে? ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল সেই উত্তর এনে দিয়েছে 'অপটোজেনেটিক্স' (Optogenetics) প্রযুক্তির মাধ্যমে।

ঘটনার সূচনা এককোষী শৈবালের ভেতর 'চ্যানেলরোডোপসিন' নামক এক বিশেষ আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন আবিষ্কার থেকে, যা সম্পাদন করেন জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান ও গেওর্গ নাগেল। পরবর্তীতে আমেরিকান নিউরোসার্জন কার্ল ডাইসারথ সেই বিশেষ প্রোটিনটি জীবন্ত প্রাণীর স্নায়ুকোষে রূপান্তর করেন। এর ফলে কেবল লেজার আলোর রশ্মি ফেলে সুনির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে অন বা অফ (On/Off) করার কৃত্রিম সুইচ তৈরি করা সম্ভব হয়।

আজ এই চিকিৎসার মাধ্যমে অন্ধত্ব দূর করা, পার্কিনসনের জটিলতা বোঝা এবং ক্ষুধা বা ব্যথার মতো মানসিক প্রতিক্রিয়াকে কোষপর্যায়ে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হচ্ছে।

পদার্থবিজ্ঞান: দক্ষিণ মেরুর বরফে মহাজাগতিক ভূতুড়ে কণার খোঁজ

পদার্থবিজ্ঞানে এককভাবে নোবেল লাভ করেছেন উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফ্রান্সিস হালজেন। তাঁর মূল অবদান আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি (IceCube Neutrino Observatory) প্রতিষ্ঠা এবং সুদূর মহাবিশ্ব থেকে আসা অতি-উচ্চ শক্তির 'নিউট্রিনো' কণা শনাক্তকরণ।

নিউট্রিনো কণাগুলোকে বলা হয় 'ভূতুড়ে কণা' (Ghost Particle)। এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং যেকোনো পদার্থের ভেতর দিয়ে অনায়াসে চলে যেতে পারে, তাই দূর-মহাকাশের অক্ষত তথ্য পরিবহনে এরা সেরা বার্তাবাহক।

বিজ্ঞানী হালজেন ১৯৮৮ সালে প্রস্তাব করেছিলেন—দক্ষিণ মেরুর অতি-স্বচ্ছ ১ ঘনকিলোমিটার বরফকে প্রাকৃতিক ডিটেক্টর বানিয়ে নিউট্রিনোর গতিপথ মাপা সম্ভব। ২০১১ সালে আইসকিউবের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর বিজ্ঞানীদের সামনে মহাজাগতিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের (Extragalactic Astronomy) এক নতুন যুগের সূচনা হয়।

রসায়ন: আয়নার মতো অণুর ধাঁধা ও একপেশে প্রকৃতির রহস্য

রসায়নে যৌথভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন ফরাসি রসায়নবিদ হেনরি বি. কাগান এবং জাপানের কেনসো সোয়াই। তাঁদের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল রসায়নশাস্ত্রের শতবর্ষী প্রাচীন রহস্য—'অপ্রতিসম জৈব সংশ্লেষণ' (Asymmetric Organic Synthesis)।

অ্যামিনো অ্যাসিড বা বহু জৈব অণুর দুটি ভিন্ন রূপ থাকে—যা দেখতে হুবহু আমাদের ডান ও বাম হাতের মতো আয়নার প্রতিবিম্ব (Enantiomers)। সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ায় দুটি রূপ সমপরিমাণে তৈরি হলেও, মানবদেহের জীবনরহস্য বা প্রোটিনে কেবল একটি রূপই পাওয়া যায়।

কাগান ও সোয়াই সম্পূর্ণ নতুন প্রক্রিয়ার নকশা করে দেখান কীভাবে রাসায়নিক বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে আয়নার যেকোনো একটি প্রতিবিম্বকে একচ্ছত্র প্রাধান্য দেওয়া যায়। জীবন ছাড়া অন্য কেউ ল্যাবরেটরিতে এর আগে এমনটা ঘটাতে পারেনি। ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধ শিল্পে কোনো ওষুধের ক্ষতিকারক পাশ কাটিয়ে কার্যকর অণুটি তৈরিতে এই আবিষ্কার রূপান্তর এনেছে।

সাহিত্য: ধ্রুপদী ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

সাহিত্যে ২০২৬ সালের নোবেল লাভ করেছেন কানাডিয়ান কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। সুইডিশ একাডেমির মূল্যায়নে বলা হয়—তিনি প্রাচীন গ্রিক ধ্রুপদী ঐতিহ্যকে আধুনিক সাহিত্য কাঠামোর সাথে অত্যন্ত চাতুর্যময় ও কৌতুকপূর্ণ সংলাপে রূপান্তর করেছেন।

কারসনের সাহিত্যশৈলী প্রচলিত কোনো নির্দিষ্ট ছকে বাঁধার সুযোগ নেই। তাঁর সর্বাধিক সমাদৃত গ্রন্থ 'অটোবায়োগ্রাফি অব রেড' (১৯৯৮), যেখানে প্রাচীন গ্রিক মিথকে লাল-ডানাবিশিষ্ট রাক্ষস গেরিয়ন-এর জীবনকাহিনি আধুনিক যুগের প্রেক্ষাপটে পুনর্কথন করা হয়েছে। এছাড়া 'ইরোস দ্য বিটারসুইট' ও 'নক্স' তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মধ্যে অন্যতম।

পুরস্কার পাওয়ার পর আইসল্যান্ডে অবস্থানরত কারসনের প্রতিক্রিয়াও ছিল ব্যতিক্রমী—তিনি পুরস্কারের সমুদয় অর্থ গৃহহীন বন্ধু ও 'ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস'-এর মতো মানবিক সংগঠনে দান করার সিদ্ধান্ত জানান।

শান্তি: আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষায় নাভি পিল্লে

​২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার অর্জন করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক আইনজ্ঞ ও অধিকারকর্মী নাভানেথেম "নাভি" পিল্লে। নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা, যুদ্ধাপরাধ প্রতিরোধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার বিচার নিশ্চিতকরণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই পরম সম্মানে ভূষিত করে।

​১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় জন্ম নেওয়া নাভি পিল্লে ছিলেন দেশটির প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী আইনজীবী। পরবর্তীতে তিনি রুয়ান্ডার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে বিশ্বজুড়ে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন।
​নরওয়ের অসলো থেকে নোবেল কমিটির ঘোষণার পর জাতিসংঘের বর্তমান মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক তাঁকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান।

নোবেল বিজয়ী নির্বাচনের জটিল পথ

একটি নোবেল পুরস্কারের ঘোষণার নেপথ্যে থাকে প্রায় এক বছরের সুদীর্ঘ ও অত্যন্ত গোপন মূল্যায়ন প্রক্রিয়া:

১. মনোনয়ন আহ্বান: প্রতি বছরের শরতে পরবর্তী বছরের জন্য বিশ্বজুড়ে ৬,০০০-এর বেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে মনোনয়নের চিঠি পাঠানো হয়। ৩১ জানুয়ারি মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ দিন।

২. স্ব-মনোনয়ন নিষিদ্ধ: কোনো প্রার্থী নিজেকে মনোনীত করতে পারেন না। এমন আবেদনের সাথে সাথেই বাতিল করা হয়।

৩. কঠোর গোপনীয়তা: প্রার্থীর নাম ও তালিকা ৫০ বছরের জন্য কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়। ফলে বাজারে প্রচলিত সকল অনুমান মূলত অনানুষ্ঠানিক।

৪. সর্বোচ্চ তিনজনের সীমা: নিয়মানুযায়ী একক কোনো বিষয়ে তিনজনের বেশি বিজ্ঞানীকে যৌথভাবে সম্মানিত করা যায় না।

শতবর্ষের আলো-ছায়া ও কিছু জানা-অজানা তথ্য

১৮৯৫ সালে ডিনামাইট আবিষ্কারক আলফ্রেড নোবেলের উইলের ওপর ভিত্তি করে ১৯০১ সাল থেকে প্রদান শুরু হয় এই বিশ্বসেরা পুরস্কারের।

•লিঙ্গসাম্য ও নোবেল: ১৯০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১,০০০-এর বেশি বিজয়ী ব্যক্তিদের মধ্যে নারী নোবেলজয়ের সংখ্যা মাত্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি (৬৮ জন)। মেরি কুরি একমাত্র নারী যিনি দুটি ভিন্ন বিজ্ঞানের বিষয়ে (পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়ন) নোবেল লাভ করেন।

•কনিষ্ঠ ও প্রবীণতম: সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পান মালালা ইউসুফজাই (১৭ বছর, ২০১৪) এবং সবচেয়ে বেশি বয়সে জন গুডএনাফ (৯৭ বছর, ২০১৯)।

•বাঙালিদের গর্ব: এ পর্যন্ত তিনজন বাঙালি বিশ্বমঞ্চে নোবেল অর্জনের মাধ্যমে গৌরব এনে দিয়েছেন—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১৩), অমর্ত্য সেন (১৯৯৮), ড. মুহাম্মদ ইউনূস (২০০৬)। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (২০১৯) বাঙালি নন; তিনি ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ।

২০২৬ সালের নোবেলজয়ী বিজ্ঞান ও সাহিত্য সাধকদের কাজের মূল যোগসূত্রটি ছিল অদেখা ও অধরাকে প্রকাশ করা—তা মস্তিষ্কের অণুকোষের আলোক-সুইচই হোক, দক্ষিণ মেরুর বরফে লুকানো কণা কিংবা সাহিত্যের প্রাচীন শব্দ গাঁথুনি। ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের প্রয়াণ দিবসে সুইডেনের রাজা আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে তুলে দেবেন এই পরম গৌরবোজ্জ্বল স্বীকৃতি।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp