২০২৬ সালের ২২–২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনব্যাপী চীন সফরের সময় দু’দেশ “নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন–বাংলাদেশ সম্প্রদায়” গড়ে তোলার ঘোষণা দেয় এবং যৌথ বিবৃতিতে চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (CMBC) এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। বেইজিংয়ে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমকে বলেন, প্রায় দেড় দশক আগে প্রস্তাবিত বাংলাদেশ–চীন–ভারত–মিয়ানমার (BCIM) করিডোর কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না পাওয়ায় এখন ত্রিপক্ষীয় কাঠামোতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে; পাশাপাশি তিনি ইঙ্গিত দেন, ভারত চাইলে ভবিষ্যতে এ করিডোরে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকবে।
প্রস্তাবিত রুট
বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রাথমিক ধারণা হলো, করিডোরটি শুরু হবে চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে, সড়ক ও রেলপথে যাবে মিয়ানমারের মান্দালয় পর্যন্ত। মান্দালয় থেকে একটি শাখা ইয়াঙ্গুনের দিকে এবং অন্যটি রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্দ্রবন্দর পর্যন্ত গিয়ে শেষ হবে; এরপর ওই বন্দর থেকে সড়ক ও রেল সংযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের কক্সবাজার–চট্টগ্রাম অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে, যদিও রুট ও প্রকল্পের কোনো আনুষ্ঠানিক মাস্টার প্ল্যান এখনো চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত হয়নি।
চীনের কৌশলগত স্বার্থ
বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর আওতায় এই করিডোর চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি বাস্তবায়িত হলে সংকীর্ণ ও কৌশলগতভাবে স্পর্শকাতর মালাক্কা প্রণালী এড়িয়ে ইউনান প্রদেশ থেকে সরাসরি ভারত মহাসাগরে পৌঁছানোর একটি অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত স্থল–সমুদ্রপথ তৈরি হবে। মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ বন্দর ছাড়াও চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের সম্ভাব্য ব্যবহার চীনের জন্য অতিরিক্ত কৌশলগত সুবিধা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের উপস্থিতি আরও সুসংহত করতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা
চীন সফরকালে বাংলাদেশ পক্ষ মংলা বন্দর সম্প্রসারণ, আনোয়ারায় চীনা অর্থনৈতিক–শিল্প অঞ্চল এবং তিস্তায় সমন্বিত নদী উন্নয়ন প্রকল্পের মতো দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ নিয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। সরকার আনোয়ারা ও মংলায় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয় স্থাপন এবং দ্রুত বিনিয়োগ লাইসেন্স ইস্যুর মতো পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে; এগুলো করিডোর বাস্তবায়নের আগেই বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
জাপানের অর্থায়নে (JICA) নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রথম ধাপ ২০২৯ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এগোচ্ছে; এটি মূলত জাপান–সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প, সরাসরি CMBC-এর অংশ না হলেও ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে করিডোরের লজিস্টিক নেটওয়ার্ককে সম্পূরক করতে পারে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের কেন্দ্রবিন্দু ছিল বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক প্রয়োজন—বিশেষত স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর নতুন বাজার–সুবিধা ধরে রাখা ও বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা—যার মধ্যে করিডোর একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত উপাদান হিসেবে এসেছে।
মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
প্রস্তাবিত রুটের বড় অংশ মিয়ানমারের মান্দালয় ও রাখাইন অঞ্চলের মধ্য দিয়ে যাবে, যেখানে বর্তমানে ব্যাপক সংঘাত ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে। বিভিন্ন স্বাধীন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ টাউনশিপ—অনেক প্রতিবেদনে ১৭টির মধ্যে ১৪টি টাউনশিপের কথা উল্লেখ আছে—নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, ফলে কিয়াউকফিউ–ঘেঁষা এলাকা একটি সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণগুলো দেখায়, জান্তা সরকার দেশজুড়ে কার্যত সীমিত অংশে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারছে; বাকি এলাকায় জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত অব্যাহত, যা দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামোগত প্রকল্পের জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
এই অস্থিরতার প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান—রাখাইনের কিয়াউকফিউ অঞ্চলে একটি চীনা–সমর্থিত গ্যাস–ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিরাপত্তাজনিত কারণে ধাপে ধাপে বন্ধ ও স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন উল্লেখ করেছে। আবার মান্দালয়–কিয়াউকফিউ রেলপথের জন্য যে সমঝোতা স্মারক (MoU) ২০২১ সালে সই হয়েছিল, তারও বাস্তব নির্মাণ–সময়সূচি এখনো পরিষ্কার নয়; বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত থামলেও পূর্ণ অর্থায়ন ও নির্মাণ শেষ হতে কয়েক দশক লাগতে পারে, তাই অনেকেই করিডোরটিকে চলতি দশকের বদলে ২০৪০–এর দশকের প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করছেন।
রোহিঙ্গা প্রশ্ন ও কক্সবাজার–রাখাইন সংযোগ
UNHCR–এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, যৌথ নিবন্ধন অনুশীলনের ভিত্তিতে ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী–জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লাখ ৫ হাজারের কিছু বেশি; ২০২৪–২৫ থেকে ২০২৬ শুরুর মধ্যে নতুন নিবন্ধন যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা আনুমানিক ১১.৯ লাখের ঘরে পৌঁছেছে। এসব শরণার্থীর বিপুল অংশ কক্সবাজারের উখিয়া–টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্প এবং ভাসানচরের আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন, যা CMBC–র সম্ভাব্য রুট–সংলগ্ন এলাকার মানবিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
রাখাইনে চলমান সংঘাত ও আরাকান আর্মির অগ্রগতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করে তুলেছে; বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উচ্চপর্যায়ে বারবার বলা হয়েছে, মিয়ানমার হয়ে যেকোনো স্থল সংযোগের বাস্তবায়ন মিয়ানমারে ন্যূনতম শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, নিরাপদ প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তার ওপর শর্তসাপেক্ষ থাকবে। চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সাম্প্রতিক আলোচনায় বিরোধীদলীয় নেতাসহ বিভিন্ন পক্ষ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সক্রিয় ভূমিকা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন, যা করিডোর আলোচনার সঙ্গে সমান্তরাল একটি কূটনৈতিক বার্তা।
বাণিজ্য ঘাটতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা
বাংলাদেশের জন্য চীন বর্তমানে সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় আমদানির উৎস এবং বাণিজ্য ঘাটতির প্রধান দেশের একটি; সংসদ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে ঘাটতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে উচ্চ, যদিও সুনির্দিষ্ট ২০২৪–২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশিত হয়নি—তাই পুরনো ঘাটতি–সংখ্যাকে হালনাগাদ হিসেবে ব্যবহার না করে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। বিশ্লেষকদের বড় অংশ মনে করেন, নিজস্ব রপ্তানি সক্ষমতা, শিল্প–বৈচিত্র্য ও মূল্য সংযোজন–ভিত্তিক উৎপাদন না বাড়িয়ে যদি করিডোরকে কেবল ট্রানজিট–নির্ভর পথে ব্যবহার করা হয়, তাহলে বহিঃঋণ ও বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আরও বাড়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
করিডোরের সম্ভাব্য লাভজনকতা তাই কেবল রাস্তা বা রেললাইন দিয়ে চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য চলাচল বাড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রপ্তানিমুখী শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিক সেবা, গুদামজাতকরণ ও মূল্য সংযোজনের সক্ষমতা তৈরির সঙ্গে করিডোরকে জুড়তে পারলে তবেই তা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হতে পারে।
ভারতের অবস্থান ও আঞ্চলিক ভূ–রাজনীতি
চীন–মিয়ানমার–বাংলাদেশ করিডোরের প্রস্তাব ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চল ও শিলিগুড়ি করিডোরের খুব কাছাকাছি জলসীমা ও ভূখণ্ডে চীনের উপস্থিতি বাড়াতে পারে বলে নয়াদিল্লি বিষয়টি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। চীনা রাষ্ট্রদূত CMBC–কে “উন্মুক্ত করিডোর” আখ্যা দিয়ে ভারতসহ অন্য দেশগুলোর জন্য যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রাখার কথা বলেছেন, তবে দিল্লি এখনো প্রকাশ্যে কোনো যোগদানের আগ্রহ দেখায়নি; বাংলাদেশের জন্য ভারত–চীন সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা একটি চলমান ও সূক্ষ্ম কূটনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে থাকছে।
ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা–সহযোগিতা ও ইন্দো–প্যাসিফিক কাঠামোর প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের নতুন করিডোর পরিকল্পনা দিল্লির জন্য কৌশলগত চাপ বাড়াতে পারে; একই সঙ্গে বাংলাদেশকেও দুই পরাশক্তির মধ্যে “ব্যালান্সিং অ্যাক্ট” বজায় রাখতে বুদ্ধিমান কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে।
ঋণ ঝুঁকি ও অর্থায়ন কাঠামো
শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা ও পাকিস্তানের CPEC–এর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, অপর্যাপ্ত আয়–উৎপাদনকারী অবকাঠামোতে বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ নিলে ঋণ–ঝুঁকি ও সার্বভৌমত্বের উদ্বেগ বাড়তে পারে। অনেক অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক CMBC–কে তাই “একক উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা” এড়িয়ে বহুপক্ষীয় অর্থায়ন, স্বচ্ছ শর্ত, কঠোর অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন, যাতে প্রকল্পটি বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ না বাড়িয়ে বাস্তব উৎপাদনশীলতা যোগ করে।
বিশেষজ্ঞরা সাধারণত একমত, CMBC–এর ঘোষণা তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের একটি উল্লেখযোগ্য ভূ–রাজনৈতিক সিগনাল হলেও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল, যা স্বল্পমেয়াদে সমাধানের লক্ষণ এখনো দুর্বল। অন্যদিকে মংলা বন্দর সম্প্রসারণ, আনোয়ারায় শিল্প অঞ্চল, তিস্তা নদী উন্নয়ন এবং বিদ্যমান বন্দর–উন্নয়ন প্রকল্পগুলো করিডোরের অগ্রগতি নির্বিশেষে তুলনামূলকভাবে দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে এবং বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুফল দিতে সক্ষম
বাংলাদেশের জন্য যৌক্তিক পথ হতে পারে—কোনো ভূ–রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পক্ষ হয়ে নয়, বরং ধাপে ধাপে, স্বচ্ছ ও বহুপক্ষীয় অর্থায়ন কাঠামোয়, নিজস্ব রপ্তানি ও শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে CMBC–এর প্রস্তাব মূল্যায়ন করা; এতে করিডোরকে শুধু পথ বা ট্রানজিট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলের একটি অংশ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।