রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে কত দূর?

রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে কত দূর?
রেমিট্যান্স: আশীর্বাদ নাকি আত্মঘাতী নির্ভরতা?

একটি দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং টিকে থাকার লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় ভরসা কী হতে পারে? কোনো খনিজ সম্পদ, নাকি কারখানার চাকা? বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে মূলত দুটি স্তম্ভের ওপর—একটি তৈরি পোশাকশিল্প, আর অন্যটি হলো প্রবাসীদের হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে পাঠানো রেমিট্যান্স। বৈশ্বিক মন্দা, মহামারি কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার উত্তাল সময়েও যে চালিকাশক্তিটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে একচুলও নড়তে দেয়নি, তা হলো রেমিট্যান্স। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে রেকর্ড পরিমাণ ৩০.৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা কেবল একটি সংখ্যা নয়; বরং এটি আমাদের অর্থনৈতিক লাইফলাইন বা জীবনরেখা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, রেমিট্যান্স কি কেবলই একটি আপদকালীন নোঙর, নাকি এটি দেশের অর্থনীতিকে স্থায়ীভাবে বদলে দেওয়ার এক অব্যবহৃত হাতিয়ার?

১) সামষ্টিক অর্থনীতির নোঙর ও রিজার্ভের সুরক্ষা

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভারসাম্য বা ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের দিকে তাকালে একটি চিরন্তন সত্য দৃশ্যমান হয়—আমাদের আমদানি ব্যয় প্রায় সময়ই রপ্তানি আয়কে ছাড়িয়ে যায়। এই যে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি, তা পূরণের প্রধানতম হাতিয়ার হলো প্রবাসী আয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখতে রেমিট্যান্সের কোনো বিকল্প নেই। ২০২২ সালের তীব্র ডলার সংকটের সময় এই রেমিট্যান্সই ছিল আমাদের অর্থনীতিকে দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করার মূল বর্ম। অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্স কেবল অর্থপ্রবাহ নয়—এটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য এক ধরনের সঞ্জীবনী শক্তি, যা সংকটকালে দেশকে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস জোগায়।

পরিসংখ্যান ঘাটলে দেখা যায়, আমাদের এই প্রবাসী আয়ের সিংহভাগই আসে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে। সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলো থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে প্রবেশ করছে। এই ভৌগোলিক বৈচিত্র্য প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি বাঙালি নীরব কর্মযজ্ঞে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখছেন।

২) গ্রামীণ অর্থনীতির পুনর্জাগরণ ও দারিদ্র্য বিমোচন

রেমিট্যান্সের সবচেয়ে সুন্দর এবং দৃশ্যমান প্রভাবটি পড়ে দেশের গ্রামীণ জনপদে। ঢাকা বা চট্টগ্রামের বড় বড় কর্পোরেট অফিসের বাইরে, প্রত্যন্ত গ্রামে প্রবাসীদের পাঠানো টাকা সরাসরি পৌঁছে যায় সাধারণ মানুষের হাতে। এই অর্থ সরাসরি গ্রামীণ পরিবারের ভোগব্যয় ও পুষ্টিমান বাড়ায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা ও কৃষিতে নতুন মূলধনের জোগান দেয়।

চট্টগ্রাম, নোয়াখালী কিংবা সিলেটের অনেক গ্রামে রেমিট্যান্স-নির্ভর পরিবারের জীবনমান স্থানীয় গড়ের চেয়েও উন্নত। এই অর্থ যখন গ্রামীণ বাজারে ঘোরে, তখন তা পরোক্ষভাবে ভ্যাট ও কর রাজস্ব বাড়াতে সরকারকে সাহায্য করে। দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি সেই হারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। এই বাস্তবতায় বিদেশে শ্রম অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা-বলয় হিসেবে কাজ করছে—যে জনশক্তি দেশে কর্মহীন থেকে যেতে পারত, তারা বিদেশে কাজ করে দেশের বেকারত্বের চাপ কমাচ্ছেন এবং পাশাপাশি রেমিট্যান্সও পাঠাচ্ছেন। ২০২৩ সালেই প্রায় ১৩ লাখ নারী ও পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে দেশের বাইরে, যা এই চাপ লাঘবের একটি বাস্তব প্রমাণ।

৩) অতিনির্ভরতার ফাঁদ এবং ডাচ ডিজিজের শঙ্কা

সব ভালোমন্দের মুদ্রার ওপিঠে একটা অন্ধকার দিকও থাকে। অর্থনীতির পরিভাষায় একটি তত্ত্ব আছে, যার নাম 'ডাচ ডিজিজ'। যখন কোনো দেশ মাত্র একটি বা দুটি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তার নিজস্ব উৎপাদনশীল খাতগুলো স্থবির হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ আজ রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর এতটাই নির্ভরশীল যে, অন্য কোনো রপ্তানি খাত মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে না। প্রবাসীদের পাঠানো টাকা যখন উৎপাদনশীল শিল্পায়নে বিনিয়োগ না হয়ে কেবল জমি কেনা, বিলাসী বাড়ি নির্মাণ কিংবা অতিরিক্ত ভোগবাদে ব্যয় হয়, তখন তা দীর্ঘমেয়াদে সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত দুর্বল করে দেয়।

এর পাশাপাশি রয়েছে তীব্র বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যদি তেলের দামের পতন বা রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে, তবে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হবেন। অতীতে লিবিয়া ও ইরাক সংকটের সময় আমরা এর সামান্য ট্রেইলার দেখেছি।

৪) হুন্ডি, সিন্ডিকেট এবং মেধা পাচারের অদৃশ্য ক্ষত

আমাদের রেমিট্যান্স খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষতটির নাম 'হুন্ডি'। ব্যাংকিং চ্যানেলের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক বা কার্ব মার্কেটে ডলারের দামের ব্যবধান বেশি থাকায় প্রবাসীরা অনেক সময় অবৈধ পথে টাকা পাঠান। এতে রাষ্ট্র কোটি কোটি ডলারের রিজার্ভ থেকে বঞ্চিত হয়। এর পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ীদের আমদানি-রপ্তানিতে আন্ডার-ইনভয়েসিং ও ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের প্রবণতা। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে টাকা বিদেশে পাচার করার মতো ঘটনা যখন গণমাধ্যমে আসে, তখন প্রবাসীরা আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

আরেকটি বড় সংকট হলো আকাশচুম্বী বিদেশগমন ব্যয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে একজন শ্রমিকের বিদেশে যেতে সবচেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। নেপালের একজন শ্রমিকের তুলনায় একজন বাংলাদেশিকে ৪ থেকে ৫ গুণ বেশি টাকা গুনতে হয়। মধ্যস্বত্বভোগী ও রিক্রুটিং এজেন্সির তৈরি করা কৃত্রিম সিন্ডিকেটের কারণে প্রবাসীরা ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে বিদেশে যান। ফলে তাদের আয়ের প্রথম কয়েক বছরের বড় অংশ চলে যায় কেবল ঋণ শোধ করতেই।

সবশেষে, আমাদের জনশক্তির সিংহভাগই অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ। প্রতিবেশী ভারতের প্রবাসীরা কারিগরি শিক্ষা ও ভাষাগত দক্ষতায় এগিয়ে থাকায় তারা বৈশ্বিক কর্পোরেট খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করছেন। অথচ আমাদের শ্রমিকেরা কঠোর পরিশ্রম করেও শুধু দক্ষতার অভাবে কম বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, দেশের ভেতরে সুযোগের অভাবে দক্ষ ও মেধাবী তরুণেরা দেশ ছাড়ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশকে এক ভয়ানক 'মেধা পাচার' বা ব্রেন ড্রেনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

৫) কৌশলগত সংস্কার:

রেমিট্যান্সকে যদি আমরা সংকটের কারণ না বানিয়ে স্থায়ী সম্ভাবনায় রূপান্তর করতে চাই, তবে নীতিনির্ধারকদের কিছু কঠোর ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত দরকার দক্ষতা উন্নয়ন—অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর বৃত্ত থেকে বের হয়ে নার্সিং, আইটি, ড্রাইভিং, কোডিং ও ভারী মেকানিক্যাল কাজের মতো কারিগরি শিক্ষায় জনশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে হবে, কারণ দক্ষ জনশক্তির শ্রমের মূল্য অনেক বেশি।

পাশাপাশি প্রয়োজন সিন্ডিকেট দমন ও খরচ হ্রাস। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর লাইসেন্স প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং অভিবাসন ব্যয় একটি যৌক্তিক সীমার মধ্যে নামিয়ে আনতে হবে, আর অবৈধ ভিসা বাণিজ্য ও হুন্ডি চক্রের বিরুদ্ধে নিতে হবে জিরো টলারেন্স নীতি। তৃতীয়ত, প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ যাতে শুধু ভোগবাদে নষ্ট না হয়ে যায়, সেজন্য বিশেষ 'রেমিট্যান্স বন্ড' কিংবা উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় সুযোগ তৈরি করা জরুরি। সবশেষে, বৈধ পথে টাকা পাঠানোকে আরও উৎসাহিত করতে বর্তমানের ২.৫ শতাংশ আর্থিক প্রণোদনাকে অদক্ষ ও স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের জন্য বাড়িয়ে অন্তত ৫ শতাংশ পর্যন্ত নেওয়া যেতে পারে।

সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সশস্ত্র সৈনিক যেমন দেশের দৃশ্যমান রক্ষক, তেমনি মরুভূমির তপ্ত বালু কিংবা বিদেশের কারখানায় ঘাম ঝরানো একেকজন প্রবাসী শ্রমিকও আমাদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের অদৃশ্য যোদ্ধা। রেমিট্যান্স আমাদের জন্য আশীর্বাদ, তবে একে একমাত্র অলস ভরসা হিসেবে দেখার দিন শেষ। দেশের ভেতরে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, করনীতির সংস্কার এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে যদি আমরা রেমিট্যান্সের সঠিক ব্যবস্থাপনা করতে পারি, তবেই বাংলাদেশ কোনো বাহ্যিক আঘাত ছাড়াই স্থায়ীভাবে একটি শক্তিশালী ও ঝুঁকিমুক্ত অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারবে।
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp