একটি নদী, দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, আর ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক চুক্তি— যা এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে সীমান্ত, কাশ্মীর কিংবা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বিতর্ক নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর থেকে এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরেকটি সম্পূর্ণ নতুন মাত্রা— পানি। ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি চুক্তি (Indus Waters Treaty বা IWT), যা দুই যুদ্ধবিধ্বস্ত প্রতিবেশীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে অবিচল ছিল, আজ সেটিই পরিণত হয়েছে সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং সম্ভাব্য বিপজ্জনক এক ভূরাজনৈতিক অস্ত্রে। প্রশ্ন উঠছে— পানি কি সত্যিই ভারত–পাকিস্তানের পরবর্তী বড় সংঘাতের সূত্রপাত ঘটাতে চলেছে?
১) সংকটের শুরু যেখানে
২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল ভারত–নিয়ন্ত্রিত জম্মু–কাশ্মীরের পেহেলগামে সশস্ত্র জঙ্গি হামলায় ২৬ জন বেসামরিক মানুষ, যাদের অধিকাংশই পর্যটক, প্রাণ হারান। এই হামলার জন্য নয়াদিল্লি পাকিস্তান–সমর্থিত জঙ্গিগোষ্ঠীকে দায়ী করে, যা ইসলামাবাদ সরাসরি অস্বীকার করে। হামলার ঠিক পরদিনই ভারত এক অত্যন্ত বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয়— ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত ঘোষণা করে, অথবা কার্যত অকার্যকর করে দেওয়ার পথে হাঁটে।
এই সিদ্ধান্তকে পাকিস্তান শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং কার্যত ‘যুদ্ধ ঘোষণার শামিল’ বলে অভিহিত করেছে। এরপর থেকে গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা, কূটনৈতিক অচলাবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে আইনি টানাপোড়েন— সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এক অস্থির বাঁকে এসে দাঁড়িয়েছে।
২) চুক্তিটি আসলে কী রক্ষা করে
সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি প্রধান নদী— সিন্ধু, ঝিলম, চেনাব, রাভি, বিয়াস ও সতলজ— দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল এই চুক্তির মাধ্যমে। পূর্বাঞ্চলীয় তিনটি নদী রাভি, বিয়াস ও সতলজের পানি ব্যবহারের অধিকার পায় ভারত, আর পশ্চিমাঞ্চলীয় সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের পানির অধিকাংশ বরাদ্দ থাকে পাকিস্তানের জন্য। প্রায় নয় বছরের আলোচনার পর ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে অনেক ভূগোলবিদ ‘হাইড্রোলিক পার্টিশন’ বা জলবিভাজন হিসেবে অভিহিত করেন, কারণ দেশভাগের রাজনৈতিক বিভাজনের পরই পানিব্যবস্থাও কার্যত বিভক্ত হয়েছিল।
পাকিস্তানের জন্য এই চুক্তি নিছক পানির হিসাব নয়— দেশটির প্রায় ৮০–৯০ শতাংশ কৃষিজমির সেচ এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি বড় অংশ সরাসরি এই নদী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। অথচ পাকিস্তানের মোট পানি সঞ্চয়ক্ষমতা খুব সীমিত; প্রায় এক মাসের প্রবাহের সমান পানি তারা জলাধারে ধরে রাখতে পারে। প্রধান দুই জলাধার তারবেলা ও মাংলা দীর্ঘদিন ধরেই ন্যূনতম স্তরের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে। ফলে চুক্তির যেকোনো অনিশ্চয়তা পাকিস্তানের জন্য অস্তিত্বসংকটের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
৩) যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র আর অস্ত্রবিরতি
পেহেলগাম হামলার প্রায় দুই সপ্তাহ পর, ৭ মে ২০২৫, ভারত পাকিস্তানের ভেতরে সীমিত সামরিক হামলা চালায়— জঙ্গি ঘাঁটি টার্গেট করার কথা বলে। পাল্টা জবাব দেয় ইসলামাবাদও। চার দিনের এই সংঘাতের সময় দুই পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় এবং সীমান্তে গোলাবিনিময় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় দুই দেশ অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয়। কিন্তু সামরিক উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমলেও পানি ইস্যুতে কোনো পক্ষই নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসেনি।
৪) আদালতে টানাপোড়েন
সিন্ধু পানি চুক্তির বিরোধ মেটাতে এতে তিন স্তরের ব্যবস্থা রয়েছে— প্রথমে স্থায়ী সিন্ধু কমিশন, এরপর নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ, এবং সবশেষে হেগভিত্তিক স্থায়ী সালিসি আদালত (Permanent Court of Arbitration বা পিসিএ)। ২০১৬ সাল থেকে ভারতের কিষাণগঙ্গা ও রাতলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে পাকিস্তান পিসিএতে অভিযোগ জানিয়ে আসছিল; পাকিস্তানের দাবি, এসব প্রকল্প পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোর প্রবাহে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত অবশ্য শুরু থেকেই সালিসি প্রক্রিয়ার কিছু অংশের এখতিয়ার প্রশ্নবিদ্ধ বলে আসছে।
২০২৫ সালের জুনে সালিসি ট্রাইব্যুনাল জানায়, সিন্ধু পানি চুক্তিতে একতরফাভাবে স্থগিতাদেশের কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই এবং তারা নিজেদের এখতিয়ার পুনর্নিশ্চিত করে একটি সম্পূরক সিদ্ধান্ত দেয়— যা ভারত ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে কার্যত অগ্রাহ্য করে। এরপর ২০২৬ সালের মে মাসে জলাধার ধারণক্ষমতা ও প্রকল্প নকশা–সংক্রান্ত আরেকটি সিদ্ধান্ত আসে, যেখানে পাকিস্তানের উত্থাপিত কিছু আশঙ্কাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং ভারতের জল নিয়ন্ত্রণ–ক্ষমতার ওপর কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয় বলে মনে করা হয়। ভারত এই সিদ্ধান্তও প্রত্যাখ্যান করেছে, দাবি করেছে ট্রাইব্যুনালটি অবৈধভাবে গঠিত এবং চুক্তির মূল কাঠামোর বাইরে চলে গেছে।
আন্তর্জাতিক আইনি ময়দানে পাকিস্তান একের পর এক তুলনামূলকভাবে অনুকূল সিদ্ধান্ত পেলেও বাস্তবে তার প্রভাব সীমিত থেকে যাচ্ছে, কারণ ভারত এই সালিসি প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো পক্ষ যদি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সিদ্ধান্ত মানতেই অস্বীকার করে, তাহলে সেই কাঠামোর বাস্তব কার্যকারিতা অবশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
৫) উত্তপ্ত বাগযুদ্ধ, সামরিক প্রস্তুতি
২০২৬ সালের জুন–জুলাইয়ে এসে উত্তেজনা আরও নতুন মাত্রা পেয়েছে। পাকিস্তানের উপ–প্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ভারতের সিদ্ধান্তকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, পানিকে কখনোই রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো উচিত নয়। পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি একাধিক জনসভায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজনে যুদ্ধ করেও পাকিস্তান নিজেদের পানির অধিকার রক্ষা করবে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফও একই সুরে বলেছেন, পানির নিরাপত্তা গুরুতর হুমকির মুখে পড়লে তার দেশ যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।
শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বই নয়, পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও এই অবস্থানে সরাসরি যুক্ত হয়েছে। সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কোর কমান্ডারস সম্মেলনে পাকিস্তানের ন্যাশনাল সিকিউরিটি কমিটির সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করা হয়— সিন্ধু নদের পানিপ্রবাহ বন্ধ করা বা ভিন্নদিকে সরানোর যেকোনো চেষ্টাকে সরাসরি যুদ্ধের শামিল হিসেবে গণ্য করা হবে।
অন্যদিকে ভারতের অবস্থানও অটল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল একাধিকবার স্পষ্ট করে বলেছেন, পাকিস্তান সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়া বিশ্বাসযোগ্য ও স্থায়ীভাবে বন্ধ না করা পর্যন্ত চুক্তি কার্যত স্থগিত অবস্থায়ই থাকবে। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ আরও এক ধাপ এগিয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সিন্ধু পানি চুক্তি আগের মতো ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।
৬) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে গতি বাড়াচ্ছে ভারত
চুক্তি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় ভারত এখন আর পাকিস্তানকে বন্যা–সংক্রান্ত আগাম তথ্য জানাতে আগের মতো বাধ্য নয় বলে দিল্লি থেকে সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলোতে সাওয়ালকোট, রাতলে, বুরসার, পাকাল দুল, কাওয়ার, কিরু ও কিরথাইয়ের মতো একাধিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে বলে খবর আছে। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, বর্তমান অবকাঠামো দিয়ে ভারতের পক্ষে বর্ষা মৌসুমে উচ্চ প্রবাহের সময় পাকিস্তানের দিকে পানি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া প্রযুক্তিগতভাবে প্রায় অসম্ভব। কিন্তু শীতের শুষ্ক মৌসুমে কিছু পানি আটকে রাখা বা প্রবাহের সময়সূচি সামান্য পরিবর্তন করার সক্ষমতাই পাকিস্তানের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, কারণ দেশটির পর্যাপ্ত বড় জলাধার নেই এবং পানি সঞ্চয়ের ক্ষমতাও খুব সীমিত।
৭) কেন এই সংকট এত জটিল
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটকে জটিল করে তুলছে কয়েকটি বাস্তবতা—
ক) ভৌগোলিক অসমতা:
ভারত উজানের দেশ, পাকিস্তান ভাটির— উজানে থাকা দেশের প্রতি ভাটির দেশের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের বড় কারণ এটিই।
খ) কাশ্মীর সংযোগ:
সিন্ধু অববাহিকার নিয়ন্ত্রণ সরাসরি কাশ্মীর অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িত, ফলে পানি বিরোধ কার্যত কাশ্মীর বিরোধেরই সম্প্রসারণ।
গ) আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা: একপক্ষ যদি আদালতের এখতিয়ারই স্বীকার না করে, তাহলে যে–কোনো রায়ের বাস্তব প্রভাব সীমিত থেকেই যায়।
ঘ)জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ: এল নিনোর প্রভাবে তীব্র তাপপ্রবাহ, বর্ষার সময়–কাল পরিবর্তন আর সম্ভাব্য খরা— সব মিলিয়ে পুরো পানিসম্পদ–ব্যবস্থাকেই আরও ভঙ্গুর করে তুলছে।
৮) কূটনীতি নাকি সংঘাত— কোন পথে দক্ষিণ এশিয়া
কিছু বিশ্লেষক ও সাবেক কূটনীতিক মনে করেন, সরাসরি সামরিক সংঘাত কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে না; দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে পানি–ইস্যুতে যুদ্ধ গোটা দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। বরং কূটনীতি, আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক আইনি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ এখনো রয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার বলেন, ভারতের আপত্তি ও পুনর্বিবেচনার অঙ্গীকারকে পাকিস্তান একটি নতুন চুক্তি বা পরিমার্জিত কাঠামোর আলোচনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো— ২০১৯ সালের পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সংলাপ কার্যত বন্ধ, আর পেহেলগাম–উত্তর পরিস্থিতিতে সেই সীমিত যোগাযোগও প্রায় বিলুপ্ত। দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা একটি পানি চুক্তি যেভাবে ভেঙে পড়ার মুখে দাঁড়িয়েছে, তা কেবল দক্ষিণ এশিয়ার জন্যই নয়, বিশ্বজুড়ে আন্তঃসীমান্ত পানিবণ্টন ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতার জন্যও একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
আগামী দিনগুলোতে এই সংকট কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান পাবে, নাকি আরও একটি সশস্ত্র সংঘাতের দিকে এগোবে— তা নির্ভর করছে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংযমের ওপর। একই সঙ্গে নির্ভর করছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির টানাপোড়েন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ও নিরপেক্ষ হস্তক্ষেপের ওপরও।