রক্তাক্ত জুলাই
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। ঢাকার রাজপথ থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্ত কেঁপে উঠেছিল ছাত্র-শ্রমিক-জনতার এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে। দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ৫ আগস্ট এসেছিল এক নতুন সূচনা। কিন্তু এই পরিবর্তনের পটভূমি কতটা রক্তস্নাত ছিল, তার একটি বিস্তারিত ও অকাট্য আন্তর্জাতিক দলিল প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ।
২০২৫ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) তাদের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যা তৈরি হয়েছিল ২৫০টিরও বেশি সাক্ষাৎকার এবং ব্যাপক ডিজিটাল প্রমাণের ভিত্তিতে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অনুরোধে গঠিত এই তদন্ত দলে ছিলেন মানবাধিকার তদন্তকারী, একজন ফরেনসিক চিকিৎসক ও একজন অস্ত্রবিশেষজ্ঞ। প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, বিক্ষোভ দমনে তৎকালীন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পরিকল্পিতভাবে যে দমন-নিপীড়ন চালানো হয়েছিল, তা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়ে থাকতে পারে এবং এ বিষয়ে অতিরিক্ত ফৌজদারি তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
১) পরিসংখ্যানের আয়নায় জুলাইয়ের নির্মমতা
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে আনুমানিক ১,৪০০ জন পর্যন্ত মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারে, যাদের সিংহভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারান। দেশীয় মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) স্বতন্ত্রভাবে পরিচালিত তাদের অনুসন্ধানে ১,০৩৫ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে এবং প্রকৃত সংখ্যা ১,৩০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে জানিয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে নিহতদের মধ্যে প্রায় ১২ থেকে ১৩ শতাংশই ছিল শিশু।
আহতের সংখ্যাও ভয়াবহ—বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার হিসাবে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন এই আন্দোলনে, যাদের মধ্যে HRSS-এর তথ্যে ৬০০ জনেরও বেশি মানুষ এক বা উভয় চোখে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন বলে উল্লেখ রয়েছে। সাংবাদিকরাও এই সহিংসতার বাইরে ছিলেন না—দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সংবাদকর্মী আহত, নির্যাতিত বা হেনস্তার শিকার হয়েছেন, এবং বিভিন্ন মানবাধিকার ও গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী অন্তত ছয়জন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জাতিসংঘের প্রতিবেদনে শুধু রাষ্ট্রীয় সহিংসতাই নয়, বরং সরকার পতনের সময় ও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, পুলিশ সদস্য ও সংবাদমাধ্যমকর্মীদের ওপর চালানো প্রতিশোধমূলক হামলার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। হিন্দু, আহমদিয়া মুসলিম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীও এই সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
২) রাষ্ট্রের পরিকল্পিত কৌশল
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করার সাধারণ প্রক্রিয়া নয়, বরং ক্ষমতা ধরে রাখার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল হিসেবেই এই দমন-অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক নিজে এই প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বলেন, সাবেক সরকারের এই নিষ্ঠুর প্রতিক্রিয়া ছিল ব্যাপক বিরোধিতার মুখে ক্ষমতা ধরে রাখার একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত কৌশল। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে এবং তাদের সমন্বয় ও নির্দেশনায় শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক বেআইনি গ্রেপ্তার ও নির্যাতন চালানো হয়েছে বলে বিশ্বাস করার যুক্তিসঙ্গত কারণ রয়েছে।
তদন্তকারী দল নথিভুক্ত করেছে যে, নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর পুলিশ, র্যাব ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি চালিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বেশিরভাগ মৃত্যুর কারণ ছিল উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক মানের রাইফেল থেকে ছোড়া গুলি, আর উল্লেখযোগ্য একটি অংশ মারা গেছেন প্রাণঘাতী ধাতব পেলেট ভরা শটগানের আঘাতে—এমন একটি অস্ত্র, যাকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে কম প্রাণঘাতী বলে বিবেচনা করতেন বলে প্রতিবেদনের সাক্ষ্যভিত্তিক বর্ণনায় উঠে এসেছে।
৩) আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিবিসি সরাসরি শিরোনাম করে যে শেখ হাসিনার দমনাভিযান মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়ে থাকতে পারে বলে জাতিসংঘ মন্তব্য করেছে। আল জাজিরাও একই সুরে জানায়, সাবেক সরকার সম্ভাব্য মানবতাবিরোধী অপরাধের পেছনে ছিল বলে জাতিসংঘের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। জাতিসংঘের নিজস্ব বার্তা সংস্থা ইউএন নিউজ এবং আরও একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এই প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বলা হয়, এসব সহিংসতার গুরুতর অংশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) বিচারযোগ্য হতে পারে, যেহেতু বাংলাদেশ রোম সংবিধির একটি রাষ্ট্রপক্ষ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর এই বিষয়ে অতিরিক্ত ফৌজদারি তদন্ত ও আইসিসি প্রসিকিউটরের দৃষ্টি আকর্ষণের সুপারিশ করেছে।
৪) জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিলই নয়, বরং অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে। প্রতিবেদনে নিরাপত্তা ও বিচার খাতে সংস্কার, নিপীড়নমূলক আইন ও প্রতিষ্ঠান বাতিল এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিস্তৃত পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট সুপারিশও দেওয়া হয়েছে।
এখন পর্যন্ত মূলত পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেই আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, কিন্তু অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা ও বাহিনীর সংশ্লিষ্টতা নিয়েও আরও জোরালো জবাবদিহিমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। ভলকার তুর্ক নিজেও বলেছেন, সত্য উদ্ঘাটন, ক্ষত নিরাময় ও জবাবদিহিতার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এই ভয়াবহ অন্যায়ের মুখোমুখি হওয়াই বাংলাদেশের জন্য সামনে এগোনোর সবচেয়ে ভালো পথ।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন প্রমাণ করে, জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে অস্বীকৃত থাকেনি। এখন সময় এই স্বীকৃতিকে বাস্তব জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারে রূপান্তরিত করার।