দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সংহতি নিয়ে আয়োজিত এক সেমিনার শেষ পর্যন্ত রূপ নিল কূটনৈতিক উত্তেজনার মঞ্চে। ঢাকায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে একটি মানচিত্র প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ভারতীয় হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা ও পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনারের মধ্যে যে বাদানুবাদ তৈরি হয়, তা আরও একবার প্রমাণ করল—দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে কাশ্মীর প্রশ্নটি এখনো কতটা স্পর্শকাতর।
ঘটনার সূত্রপাত
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (BIISS) এক বিশেষ সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল ‘রিবিল্ডিং ট্রাস্ট, রিনিউইং রিজিওনাল ইন্টিগ্রেশন: পাথওয়েজ ফর রিভাইটালাইজিং সার্ক’ শিরোনামে একটি সেমিনারের আয়োজন করে, যেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করছিলেন দিল্লিতে বাংলাদেশের সাবেক হাইকমিশনার, রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম। আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার সময় স্ক্রিনে প্রদর্শিত একটি মানচিত্রে জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলকে ভারতের সীমানার বাইরে দেখানো হয়, যা মুহূর্তেই সেমিনারের পরিবেশ পাল্টে দেয়।
ভারতের আপত্তি ও উপস্থাপকের ব্যাখ্যা
দর্শকসারিতে উপস্থিত ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক ও তথ্য) পূজা কুমারী ঝা বক্তব্য চলাকালীনই আপত্তি তোলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রদর্শিত মানচিত্রটি ভুল, কারণ জম্মু ও কাশ্মীরকে তিনি ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে উল্লেখ করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আপত্তি নথিভুক্ত করার অনুরোধ জানান।
জবাবে রাষ্ট্রদূত তারিক এ করিম ব্যাখ্যা দেন যে মানচিত্রটি কোনো রাজনৈতিক সীমারেখা নির্দেশের উদ্দেশ্যে নয়, বরং নিছক আলোচনার সুবিধার্থে প্রতীকী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবু ভারতীয় কূটনীতিকের আপত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়।
পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া
এই আপত্তির পরপরই প্রতিক্রিয়া জানান পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার মুহাম্মাদ ওয়াসিফ। তিনি নিজের অবস্থান ও কাশ্মীর প্রশ্নের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে অতিরিক্ত সময় চান, যদিও সঞ্চালনার স্বার্থে তাঁকে মূল বক্তব্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলা হয়। সেমিনার শেষ হওয়ার আগেই মিলনায়তন ত্যাগ করেন পূজা কুমারী ঝা। পরে সাংবাদিকদের কাছে পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার ভারতের এই প্রতিক্রিয়াকে সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচয় বলে মন্তব্য করেন এবং একে সার্কের নিষ্ক্রিয়তার একটি কারণ হিসেবে তুলে ধরেন।
উপস্থিত কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে অবশ্য মনে করছেন, আপত্তি জানানোর অধিকার থাকলেও চলমান বক্তব্যের মাঝপথে প্রতিবাদ তোলাটা কূটনৈতিক শিষ্টাচারের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ ছিল না।
কেন এত স্পর্শকাতর কাশ্মীরের মানচিত্র
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর থেকে কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান একাধিক সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। বর্তমানে অঞ্চলটি ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর এবং পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরে বিভক্ত, আর দুই দেশই নিজ নিজ সরকারি মানচিত্রে পুরো অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দেখায়। এই বিরোধের কারণেই মানচিত্রে অঞ্চলটির উপস্থাপনা প্রায়ই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্কের জন্ম দেয়।
এপ্রিলে নেপাল এয়ারলাইন্সের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি রুট-ম্যাপে জম্মু, কাশ্মীর ও লাদাখকে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে দেখানো হলে ভারতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সংস্থাটি পোস্ট সরিয়ে নিয়ে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায়। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্য দফতরের প্রকাশিত মানচিত্র নিয়েও অতীতে ভারত-পাকিস্তান উভয় পক্ষ থেকে আপত্তি উঠেছে। এসব বিতর্ক এড়াতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সাধারণত এই সীমান্তরেখাকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের অংশ না দেখিয়ে নিরপেক্ষ ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ হিসেবে বিন্দুরেখায় উপস্থাপন করার চর্চা মেনে চলে।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
সার্ক পুনরুজ্জীবনের মতো একটি সহযোগিতামূলক আলোচনার আসরে ভারত-পাকিস্তানের এই মুখোমুখি অবস্থান বিশ্লেষকদের কাছে একটি পরিচিত বার্তাই বহন করছে—দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো আঞ্চলিক আলোচনায় কাশ্মীর প্রশ্নটি কখনোই পুরোপুরি পটভূমিতে থাকে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের এই সময়ে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি ঢাকার কূটনৈতিক মহলের জন্যও একটি সতর্কবার্তা—আন্তর্জাতিক ফোরামে মানচিত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা এখন অপরিহার্য।