গত কয়েক দশক ধরে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে একের পর এক অস্থিরতা ও সংঘাত নতুন করে পারমাণবিক ঝুঁকির প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যেখানে পরিস্থিতিকে পারমাণবিক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে বলে সতর্ক করেছেন, সেখানে ইরান দাবি করছে তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
এই উত্তেজনার মাঝে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—বিশ্বে আসলে কতটি দেশের কাছে এই বিধ্বংসী অস্ত্র আছে, আর প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই যুগেও কেন যেকোনো দেশ চাইলেই পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলতে পারে না?
১) বিশ্বের পারমাণবিক মানচিত্র: কার হাতে কত অস্ত্র
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (SIPRI) সর্বশেষ ইয়ারবুক অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শুরুতে বিশ্বের মাত্র নয়টি দেশের কাছে পারমাণবিক অস্ত্র ছিল, যার মোট সংখ্যা প্রায় ১২,২৪১টি। এই তালিকার শীর্ষে আছে রাশিয়া, যাদের হাতে অবসরপ্রাপ্ত অস্ত্রসহ প্রায় ৫,৪৫৯টি ওয়ারহেড রয়েছে, আর দ্বিতীয় স্থানে যুক্তরাষ্ট্র, প্রায় ৫,১৭৭টি নিয়ে। এই দুই পরাশক্তির হাতেই কেন্দ্রীভূত আছে বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৯০ শতাংশ।
এরপরই আছে চীন, যাদের অস্ত্রসংখ্যা এখন প্রায় ৬০০। SIPRI-র হিসাব অনুযায়ী ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের হাতে থাকা ওয়ারহেডের সংখ্যা ৫০০ থেকে ৬০০-তে উঠেছে, অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ১০০টি নতুন ওয়ারহেড যোগ হয়েছে। এ কারণে চীনকে বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম গতিতে পারমাণবিক অস্ত্রাগার সম্প্রসারণকারী দেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাকি দুই স্থায়ী সদস্য ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের হাতে আছে যথাক্রমে প্রায় ২৯০ ও ২২৫টি অস্ত্র।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের মজুদ প্রায় ১৮০টি, আর পাকিস্তানের প্রায় ১৭০টি—দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যে ব্যবধান সামান্যই, যদিও চীনের অস্ত্রাগার এই দুই দেশের তুলনায় কয়েকগুণ বড়। এ ছাড়া ইসরায়েলের হাতে আনুমানিক ৯০টি অস্ত্র আছে বলে ধারণা করা হয়, যদিও দেশটি নিজের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ‘ধূম্রজাল’ নীতি বজায় রেখেছে। তালিকার সবশেষে আছে উত্তর কোরিয়া, যাদের অস্ত্রসংখ্যা প্রায় ৫০টি বলে ধারণা করা হয়—এনপিটি চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে পরমাণু পরীক্ষা চালানো একমাত্র দেশ এটিই।
২) চাইলেই কেন পারমাণবিক বোমা বানানো যায় না
পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রক্রিয়া কেবল একটি বৈজ্ঞানিক সূত্র জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাত্ত্বিক জ্ঞান আজকের দুনিয়ায় সহজলভ্য হলেও, বাস্তবে একটি কার্যকর অস্ত্র তৈরির পথে দাঁড়িয়ে আছে প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জটিলতার এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর।
প্রথম বাধাটি আসে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের পর্যায়ে। প্রকৃতিতে প্রাপ্ত ইউরেনিয়ামে অস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় ইউরেনিয়াম-২৩৫ থাকে মাত্র ০.৭ শতাংশ, অথচ অস্ত্র তৈরির উপযোগী মানে পৌঁছাতে একে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ করতে হয়। এই কাজের জন্য প্রয়োজন হাজার হাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল সেন্ট্রিফিউজ যন্ত্র, যেগুলোকে দীর্ঘ ক্যাসকেডে সাজিয়ে মাসের পর মাস নিখুঁতভাবে চালাতে হয়—একটিমাত্র যন্ত্র বিকল হলে পুরো প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
দ্বিতীয় বাধা হলো বিশেষ উপকরণের দুষ্প্রাপ্যতা। সেন্ট্রিফিউজ ও পারমাণবিক চুল্লি তৈরিতে প্রয়োজন হয় নির্দিষ্ট মানের অ্যালুমিনিয়াম সংকর, কার্বন ফাইবার, মারেজিং স্টিল এবং উচ্চ ক্ষমতার ভ্যাকুয়াম পাম্পের মতো উপাদান। বিশ্ববাজারে এসব উপকরণের কেনাবেচা কঠোর রপ্তানি-নিয়ন্ত্রণের আওতায় থাকে, ফলে কোনো দেশ বিপুল পরিমাণে এসব কিনতে গেলেই তা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নজরদারিতে চলে আসে।
তৃতীয় বাধাটি প্রকৌশলগত—ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারলেই বোমা তৈরি শেষ হয় না। সেই উপাদানকে ক্ষেপণাস্ত্রের মাথায় বসানোর উপযোগী করে ছোট ও নির্ভরযোগ্য আকারে রূপ দেওয়া, অর্থাৎ ক্ষুদ্রকরণ, নিজেই একটি বড় প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ, যা সফল না হলে পুরো কর্মসূচি কার্যকারিতা হারায়।
৩) আন্তর্জাতিক আইন ও নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল
প্রযুক্তিগত বাধার চেয়েও বড় প্রতিবন্ধকতা হলো আন্তর্জাতিক আইন ও ভূরাজনৈতিক চাপ। ১৯৬৮ সালে স্বাক্ষরিত ও ১৯৭০ সালে কার্যকর হওয়া পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি অনুযায়ী, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও চীন—ছাড়া অন্য কোনো দেশের নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অনুমতি নেই, কারণ এই পাঁচ দেশ ১৯৬৭ সালের আগেই পরমাণু পরীক্ষা সম্পন্ন করেছিল। বর্তমানে বিশ্বের ১৯১টি রাষ্ট্র এই চুক্তির পক্ষভুক্ত, যার মধ্যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত এবং বাকিরা অ-পারমাণবিক রাষ্ট্র।
ভারত, পাকিস্তান ও ইসরায়েল কখনোই এই চুক্তিতে সই করেনি, আর উত্তর কোরিয়া শুরুতে সই করলেও পরে চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়ে পরমাণু পরীক্ষা চালায়। ইসরায়েল নিজের পারমাণবিক সক্ষমতার কথা স্বীকার বা অস্বীকার—কোনোটিই করে না, এবং এনপিটিতে সই না করায় অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু সংস্থার (IAEA) পূর্ণাঙ্গ পরিদর্শন ও সেফগার্ড প্রযোজ্য নয়।
কোনো দেশ যদি গোপনে বা প্রকাশ্যে এনপিটি লঙ্ঘন করে অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করে, তবে তাকে মারাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়। প্রথমত, আন্তর্জাতিক লেনদেন ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নিষেধাজ্ঞা নেমে আসে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তোলে—ইরান ও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে যা স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। দ্বিতীয়ত, সাইবার হামলা ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে পারমাণবিক কর্মসূচি কয়েক বছর পিছিয়ে দেওয়ার নজিরও রয়েছে। তৃতীয়ত, কোনো দেশ অস্ত্র তৈরির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে মনে হলে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সরাসরি সামরিক হামলার নজিরও ইতিহাসে আছে—১৯৮১ সালে ইরাকের ওসিরাক চুল্লিতে ইসরায়েলের হামলা এবং ২০০৭ সালে সিরিয়ার একটি স্থাপনায় চালানো হামলা এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
শেষ কথা
পারমাণবিক অস্ত্র কোনো সাধারণ সামরিক সরঞ্জাম নয়—এটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক আধিপত্যের প্রতীক এবং মানব সভ্যতার জন্য অন্যতম বড় হুমকি। কারিগরি দক্ষতা, বিপুল অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং আন্তর্জাতিক চাপ সহ্য করার ক্ষমতা ছাড়া বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নতুন করে এই ক্লাবে যুক্ত হওয়া প্রায় অসম্ভব। আর এই কারণেই তত্ত্ব জানা থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ দেশের জন্য পারমাণবিক অস্ত্রের পথ কার্যত রুদ্ধ হয়েই থাকে।