স্ক্রিন থেকে রাজপথ
১৮ জুলাইয়ের সেই রাতের কথা মনে আছে? সন্ধ্যার পর হঠাৎ করেই দেশজুড়ে বন্ধ হয়ে যায় মোবাইল ইন্টারনেট, রাতের মধ্যেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ব্রডব্যান্ড সংযোগও। মুঠোফোনের স্ক্রিনগুলো অন্ধকার, অথচ রাজপথ তখনো উত্তাল। প্রথাগত যেকোনো আন্দোলনের ইতিহাসে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া মানেই যোগাযোগের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম—যাকে বলা হয় জেন-জি বা জেনারেশন জেড—প্রমাণ করে দিল, তারা কেবল ডিজিটাল নেটিভ নয়; সংকটে তারা কৌশল বদলে ফেলতে জানে।
৯টা-৫টার চাকরি বা সিনিয়রকে প্রশ্নাতীতভাবে মেনে চলার সংস্কৃতির প্রতি অবাধ্য, পরিবারের চোখে ‘সারাদিন ফোনে বুঁদ থাকা’ যে তরুণদের নিয়ে একসময় সমালোচনা হতো, সেই জেন-জিই তাদের চেনা ডিজিটাল নেটওয়ার্কিং আর রক্তভেজা রাজপথের লড়াইকে একসাথে মিলিয়ে জন্ম দিয়েছিল এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের।
১) যখন মেসেঞ্জার গ্রুপ হয়ে ওঠে সমন্বয়ের কেন্দ্র
জুলাই বিপ্লবের প্রথম পর্বটা শুরু হয়েছিল স্ক্রিনে, যা পরে রাজপথের প্রতিটি ইঞ্চিতে ছড়িয়ে পড়ে। জেন-জি ভালোভাবেই জানত কীভাবে ফেসবুকের অ্যালগরিদম কাজ করে এবং কীভাবে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হয়। প্রথাগত কোনো দলীয় কার্যালয় ছিল না এই তরুণদের হাতে। তার বদলে মেসেঞ্জার গ্রুপ, টেলিগ্রাম চ্যানেল ও নানা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে সমন্বয় করা হতো জরুরি তথ্য—কোথায় সংঘর্ষ চলছে, কোথায় মেডিকেল সহায়তা প্রয়োজন, কোথায় রক্তের প্রয়োজন। এই তাৎক্ষণিক তথ্য-আদান-প্রদানই আন্দোলনকে দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করেছিল।
১৮ জুলাই যখন ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেল, তখন আন্দোলন স্তব্ধ হয়ে যায়নি, বরং আরও বেশি মাঠমুখী হয়ে ওঠে। খবর ছড়ানো হয়েছে মুখে মুখে, মসজিদের মাইক ব্যবহার করে, দেয়ালে দেয়ালে লেখার মাধ্যমে। প্রায় দশ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেট ফিরে আসতে থাকলে, অনেকেই ভিপিএন ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তবে বিভিন্ন সময়ে ফেসবুক–ইনস্টাগ্রামসহ প্রধান সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং ভিপিএনের পথও আংশিকভাবে বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল।
২) মিম, রঙিন প্রোফাইল আর প্রতিরোধের নতুন ভাষা
জেন-জি প্রথাগত রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে আন্দোলনের একটি নতুন নান্দনিক ভাষা তৈরি করেছিল, যা সাধারণ মানুষকে ঘরের ভেতর থেকে রাস্তায় টেনে আনতে সাহায্য করেছে। এর একটি বড় উদাহরণ ছিল প্রোফাইল ছবি লাল রঙে ঢেকে দেওয়ার প্রবণতা—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই সম্মিলিত প্রতীকী প্রতিবাদ একজন ঘরে বসে থাকা শিক্ষার্থীকেও বুঝিয়ে দিয়েছিল, সে একা নয়। এর পাশাপাশি ব্যঙ্গাত্মক মিম, দেয়ালচিত্র এবং প্রতিবাদী র্যাপ গান দিয়ে তারা রাষ্ট্রীয় বয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এই শিল্প-প্রকাশ শুধু স্ক্রিনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্ল্যাকার্ড হয়ে রাজপথেও নেমে এসেছিল।
৩) অনলাইন থেকে অফলাইন: রাজপথের বাস্তব দায়িত্ব
ডিজিটাল সংযোগের সবচেয়ে বড় প্রভাব দেখা গিয়েছিল যখন এই তরুণেরা স্ক্রিন ছেড়ে সশরীরে রাজপথের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছিল। অনলাইনে সংগঠিত হওয়া মানুষগুলো বাস্তবে আহতদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, রক্ত সংগ্রহ ও পানি-খাবার বিতরণের মতো কাজে সরাসরি যুক্ত হয়ে যায়।
সরকার পতনের পরের দিনগুলোতে জেন-জির এই সক্রিয়তা আরও বিস্তৃত রূপ নেয়। রাষ্ট্রীয় শূন্যতার একটি সময়ে তারা নিজেরাই ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে সাময়িকভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নেয়, দল বেঁধে পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামে এবং শহরের দেয়ালে দেয়ালে এঁকে দেয় নতুন বাংলাদেশের স্বপ্নের ছবি। অনলাইন নেটওয়ার্কিং কত দ্রুত বাস্তব জীবনের নাগরিক উদ্যোগে রূপ নিতে পারে, জুলাই বিপ্লব তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে থাকবে।
৪) সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন
তবে এই নেটওয়ার্ক-নির্ভর আন্দোলনের নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। এর কোনো স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা রাজনৈতিক সংগঠন নেই। ফলে আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ হলেও রাষ্ট্র সংস্কারের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল প্রক্রিয়ায় এই স্বতঃস্ফূর্ত শক্তিকে ধরে রাখা কতটা সম্ভব, তা এখনো একটি বড় প্রশ্ন। এর সাথে যুক্ত হয় দীর্ঘ সময় ধরে সংকটের মুখোমুখি হওয়া তরুণদের মানসিক ক্লান্তি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও ভুল তথ্যের চ্যালেঞ্জ, যা আন্দোলনের মূল বার্তাকে বিভ্রান্ত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
এই সীমাবদ্ধতাগুলো মাথায় রেখেও এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব তরুণ আন্দোলনের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। জেন-জি দেখিয়ে দিয়েছে, প্রয়োজনে তারা যেমন মুহূর্তের মধ্যে অনলাইন নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে, তেমনি রাজপথের ঝুঁকিও নিতে পিছপা হয় না। ডিজিটাল দুনিয়ার সংযোগ আর রাজপথের সাহস—এই দুইয়ের মিলনেই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।