শব্দের বারুদ, সুরের আগুন: জুলাইয়ের স্লোগান যেভাবে একটা দেশকে জাগিয়েছিল
ইতিহাসে এমন কিছু সময় আসে, যখন একটি জাতির অনুভূতি হাজারো মানুষের কণ্ঠে একই শব্দ হয়ে ধ্বনিত হয়। তখন ভাষা আর শুধু যোগাযোগের মাধ্যম থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং পরিবর্তনের অস্ত্র। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল তেমনই এক সময়। শুরুটা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে। কিন্তু মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে সেই দাবি পরিণত হয় একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে। আর এই পুরো যাত্রাপথে মানুষের হাতে যেমন ছিল প্ল্যাকার্ড, তেমনি কণ্ঠে ছিল স্লোগান এবং হৃদয়ে ছিল গান।
জুলাই আন্দোলনের ইতিহাস লিখতে গেলে শুধু ঘটনাক্রম নয়, এর ভাষাকেও বুঝতে হবে। কারণ এই আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি লুকিয়ে ছিল তার উচ্চারিত শব্দে। যে শব্দ কখনো ক্ষোভের, কখনো শোকের, কখনো বিদ্রূপের, আবার কখনো অদম্য আশার প্রতিধ্বনি হয়ে রাজপথ কাঁপিয়েছে।
কোটা থেকে যেভাবে শুরু
১ জুলাই ২০২৪। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীরা প্রথম যখন রাস্তায় নামে, তাদের দাবিটা ছিল সরল ও স্পষ্ট—সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কার। মুখে মুখে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছিল কয়েকটি সরাসরি স্লোগান—
“কোটা না মেধা—মেধা, মেধা।” “সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে।” “আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই।”
এই স্লোগানগুলোর ভেতরে সরাসরি ক্ষমতা পাল্টানোর কথা ছিল না, ছিল ন্যায্যতা আর সমতার দাবি। তাই প্রথম দিকে দেশের নানা প্রান্ত থেকে এই আন্দোলনের প্রতি সহমর্মিতা আর সমর্থন আসতে থাকে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জেলা শহর—সব জায়গায়ই। কোটা প্রশ্ন ধীরে ধীরে বৈষম্যবিরোধী বৃহত্তর আলোচনায় পরিণত হয়, আর স্লোগানগুলো সেই আলোচনার ভাষা হয়ে ওঠে।
রাজাকার শব্দের উল্টো চাল
সব হিসাব বদলে যায় ১৫ জুলাইয়ের পরের দিনগুলোতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে যখন ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয় এবং শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা একটি মন্তব্য তরুণদের ক্ষোভকে বাড়িয়ে দেয়, তখন আন্দোলনের ভাষাও পাল্টে যায়। এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশ্ন তোলেন:
"মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?"
এই একটি মন্তব্যেই সব হিসাব বদলে যায়. সেই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং মধ্যরাতে পুরো এলাকা এক অভূতপূর্ব স্লোগানে কেঁপে ওঠে:
“তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার।” “কে বলেছে, কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।” “চাইলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার।”
প্রায় দেড় দশক ধরে ‘রাজাকার’ শব্দটা বিরোধী কণ্ঠকে ছোট করার, ভয় দেখানোর আর রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য তকমা লাগানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়ে এসেছে। জুলাইয়ের তরুণরা সেই একই শব্দটা তুলে নিয়ে উল্টো ছুড়ে দিল ক্ষমতার দিকে। একটা শব্দকে উল্টো করে ব্যবহার করার এই কৌশল ভয়ের দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরায়—যে অভিধা দিয়ে এতদিন বিরোধীদের চুপ করানো হয়েছে, সেটা হঠাৎ করেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে অভিযুক্তির ভাষায় পরিণত হয়।
শহীদের রক্তে নতুন স্লোগান
১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আবু সাঈদ। বুক পেতে দাঁড়ানো একজন তরুণের এই মৃত্যু টেলিভিশন আর ফোনের পর্দা পেরিয়ে খুব দ্রুতই প্রতিটি ঘরে পৌঁছে যায়। এর পর আন্দোলন আর শুধু দাবি–দাওয়ার জায়গায় থাকে না; তা হয়ে ওঠে রক্তের হিসাব চাওয়ার জায়গা।
এই সময়কার স্লোগানগুলোতে তাই ক্ষোভ, শোক আর চ্যালেঞ্জ—সবই একসাথে কাজ করে:
“বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।” “আমার ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না!”
“তোর কোটা তুই নে, আমার ভাই ফিরিয়ে দে।” “লাশের ভেতর জীবন দে, নইলে গদি ছাইড়া দে।”
দুই দিন পর, ১৮ জুলাই উত্তরায় আরেকটি ঘটনা এই আন্দোলনের আবেগকে আরও গভীর করে। তৃষ্ণার্ত শিক্ষার্থীদের হাতে পানি তুলে দিতে গিয়ে গুলিতে প্রাণ হারান মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। তাঁর শেষ ডাক—“পানি লাগবে পানি?”—কোনো স্লোগান লেখকের কলম থেকে আসা লাইন ছিল না, রাস্তার বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেওয়া একটি সাধারণ বাক্য। কিন্তু এই সাধারণ বাক্যটাই পরের দিনগুলোতে হয়ে ওঠে আন্দোলনের সবচেয়ে গভীর প্রতীক—একটি মানবিক ইশারা আর তার বিনিময়ে গুলির বাস্তবতা।
শহীদদের পরের সময়ে গড়ে ওঠা স্লোগানগুলো তাই শুধু রাজনৈতিক নয়, ছিল শোক আর বিচার–দাবির মিশেল, যেখানে একদিকে রাষ্ট্রের সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন, অন্যদিকে বিচারহীনতার দীর্ঘ ইতিহাসের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের প্রকাশ দেখা যায়—
“আমার ভাই কবরে, খুনিরা কেন বাইরে?”,
“লাশের হিসাব কে দেবে, কোন কোটায় দাফন হবে?”
হাসি ও ব্যঙ্গ দিয়ে ভয় ভাঙা
সবার আগে নিজেকে অজেয় দেখানো—প্রায় সব ধরনের দীর্ঘস্থায়ী শাসনের একটা কমন কৌশল। জুলাইয়ের তরুণরা সেই অজেয়–ইমেজটাকে ভাঙতে বেছে নিয়েছে হাসি আর ব্যঙ্গকে। মিম, কৌতুক, আঞ্চলিক টিপ্পনী—সব মিলিয়ে তারা তৈরি করেছে প্রতিরোধের আরেকটি ভাষা।
সাবেক সেতুমন্ত্রীর একটি ভুল ইংরেজি বাক্য থেকে জন্ম নেয় জনপ্রিয় মিম: “She has made us fly faster.” ইন্টারনেট বন্ধ নিয়ে কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা কটাক্ষ করে দেয়ালে দেয়ালে লেখা পড়ে—
“আমরা ইন্টারনেট বন্ধ করি নাই, একা একা বন্ধ হয়ে গেছে!”,
“নাটক কম করো পিও।”,
“পুলিশ তুমি পোশাক ছাড়ো, মুজিব কোট গায়ে পরো।”
যাকে ভয় পাও, তাকে নিয়ে একবার হাসতে পারলে সেই ভয়টা আর আগের মতো থাকে না—এই মানসিক সত্যিটাকে আন্দোলনকারীরা খুব সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন। ব্যঙ্গাত্মক এসব লাইন ক্ষমতার ব্যক্তিগত ও প্রতীকী ইমেজকে ছোট করেছে, এবং ভয়ের জায়গায় তৈরি করেছে দূরত্ব আর প্রশ্ন তোলার সাহস।
যখন গান খবরের জায়গা নিল
টেলিভিশন ও মূলধারার সংবাদমাধ্যম যখন পুরো সত্য দেখাতে ব্যর্থ হয় বা সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে, তখন রাস্তার গানই হয়ে ওঠে খবরের বিকল্প মাধ্যম। প্রতিবাদী গানগুলো একদিকে আন্দোলনের আবেগের ভাষা, অন্যদিকে চলমান বাস্তবতার অনানুষ্ঠানিক প্রতিবেদনও বটে।
আলোকচিত্রী মনজুর হোসেনের সংকলিত ‘জুলাইয়ের গান’-এ জায়গা পেয়েছে বহু প্রতিবাদী গান—যেগুলো কখনো মিছিলে, কখনো মোবাইল স্ক্রিনে, কখনো গ্রাফিতির নিচে শিরোনাম হিসেবে বেজেছে। এর মধ্যে র্যাপার হান্নান হোসাইন শিমুলের ‘আওয়াজ উডা’ আর মোহাম্মদ সেজানের ‘কথা ক’—এই দুই গান তরুণদের ভেতরের চাপা রাগ আর অস্থিরতাকে ভাষা দিয়েছে; এসব গানের কারণে শিল্পীদের গ্রেপ্তার হওয়া নিজেই পরিণত হয়েছে আরেক ধরনের প্রতিবাদের ঘটনারূপে।
পুরনো গানও নতুন করে অর্থ পেয়েছে। শূন্য ব্যান্ডের এক দশক আগের একটি গান, যার কথায় একজনের বদলে অনেকজনের সম্মিলিত শক্তির কথা বলা হয়েছিল, দেয়ালে লেখা আর রাস্তায় গাইতে গাইতে যেন হয়ে উঠেছে জুলাইয়ের সামষ্টিক কণ্ঠের পরিচয়। নজরুলের স্বাধীনতাকামী কবিতা কিংবা নতুন প্রজন্মের গান পুরনো ও নতুন প্রতিরোধের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে—একদিকে মুক্তিযুদ্ধ ও পুরনো আন্দোলনের স্মৃতি, অন্যদিকে বর্তমান তরুণদের স্বপ্ন ও ক্ষোভ এক সুতোয় গেঁথে গেছে।
এক দফা: যখন সব দাবি একটিতে মিলে যায়
আগস্টের শুরুতে আন্দোলনের পরিধি যখন শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমিত থাকে না—রিকশাচালক, দোকানদার থেকে শুরু করে স্কুল–কলেজের ছাত্র পর্যন্ত নানান স্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে—তখন পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে। আলোচনার প্রস্তাব এলে আন্দোলনের সমন্বয়কারীদের জবাব ছিল স্পষ্ট: “রক্ত মাড়িয়ে সংলাপ নয়।”
শেষ তিন সপ্তাহে বিভিন্ন স্লোগান আর দাবির সমাহার ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে টেনে আনা হয় একটি মাত্র দাবিতে, যাকে বলা হয় “এক দফা”—
“এক দফা এক দাবি, শেখ হাসিনা কবে যাবি?” “এক–দুই–তিন–চার, শেখ হাসিনা গদি ছাড়।” “আপস না সংগ্রাম? সংগ্রাম, সংগ্রাম!”
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ভেসে আসা লাইন—“আঁর ন হাঁইয়্যে, বৌতদিন হাঁইয়্য” (আর খেয়ো না, অনেক দিন খেয়েছ)—মনে করিয়ে দেয় যে এই ক্ষোভ শুধু ঢাকার ছিল না, ছিল সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা মানুষের অপ্রাপ্তি আর ক্লান্তির প্রকাশ।
৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। সেই দিনই রাজপথে উঠে আসে নতুন একটি লাইন, যা বহু বছরের “বিকল্প নেতৃত্ব”-যুক্ত রাজনীতির ভাষাকে প্রশ্ন করে—“বিকল্প কে? আমি, তুমি, আমরা।” এই স্লোগানে আন্দোলনকারীরা পরিষ্কার বার্তা দিয়েছেন—পরিবর্তনের অধিকার কোনো একক দলের বা ব্যক্তির হাতে নয়, বরং নাগরিক সমাজের সামষ্টিক ইচ্ছার হাতে।
এই সময়ের বাকি স্লোগানগুলো—“যে হাত গুলি করে, সে হাত ভেঙে দাও”, “জাস্টিস, জাস্টিস—উই ওয়ান্ট জাস্টিস”, “হাল ছেড়ো না বন্ধু, বরং কণ্ঠ ছাড় জোরে”, “যদি তুমি ভয় পাও তবে তুমি শেষ, যদি তুমি রুখে দাঁড়াও তবে তুমিই বাংলাদেশ”—একই সুরে বাঁধা: ক্ষোভ, দাবি আর অবিচল সাহসের এক যৌথ উচ্চারণ। এগুলো শুধু ক্ষণস্থায়ী স্লোগান নয়; এমন বাক্য, যা ভবিষ্যতের পাঠ্যবই, গবেষণা এবং ব্যক্তিগত স্মৃতিতে সমানভাবে ফিরে আসবে।
জুলাই ২০২৪ শুধু একটি সরকার পতনের গল্প নয়। এটি একটি ভাষার জন্ম নেওয়ার গল্প, যেখানে ভয় ভাঙতে লেগেছিল একটি স্লোগান, আর কান্না জমা রাখতে লেগেছিল একটি গান। দীর্ঘ নীরবতার পর যে শব্দগুলি হঠাৎ করে রাস্তায়, দেয়ালে, মোবাইল স্ক্রিনে একসাথে গর্জে উঠেছিল, সেগুলো এখন এই দেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
এই ভাষা পরবর্তী সময়ে কীভাবে পাঠ্যবই, গবেষণা আর শিল্প–সাহিত্যে নিজের জায়গা করে নেবে—সেই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতই দেবে। তবে একটা কথা এখনই স্পষ্ট: জুলাইয়ের স্লোগান আর সুর প্রমাণ করেছে, সংগঠিত কণ্ঠস্বরের সামনে কোনো সেন্সরই শেষ পর্যন্ত টিকতে পারে না।