জুলাইয়ের সেই ছত্রিশ দিন

জুলাইয়ের সেই ছত্রিশ দিন
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাঁক বদলগুলো কোনো অলৌকিক শক্তির হাত ধরে আসে না। কোনো অতিমানব এসে রাতারাতি সমাজ বদলে দেবে—এই রোমান্টিক ধারণাটাই আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক বিভ্রম। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত লিখে রেখে যায় সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প। ২০২৪-এর জুলাইয়ে আমরা সেই গল্পেরই এক মহাসমাবেশ দেখেছিলাম। এই সাহস কোনো ঠান্ডা মাথার হিসাব-নিকাশ থেকে জন্মায়নি; এটি ছিল দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া একটা প্রজন্মের মর্যাদা রক্ষার শেষ মরিয়া লড়াই।

​চীনের ল্যু স্যুন এক জায়গায় বলেছিলেন, জাতিকে উদ্ধারের জন্য কোনো একক প্রতিভাবানের অপেক্ষায় বসে থাকা অর্থহীন; বরং এমন এক উর্বর মাটি তৈরি করা প্রয়োজন, যেখানে অসংখ্য মেধার জন্ম হতে পারে। বাংলাদেশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান ল্যু স্যুনের সেই ভাবনারই এক জীবন্ত দলিল। এই আন্দোলনের কোনো সুনির্দিষ্ট একচ্ছত্র অধিনায়ক ছিল না, ছিল না কোনো দৃশ্যমান জাদুকর। ছিল হাজার হাজার তরুণের চোখে জ্বলে ওঠা ক্ষোভ, আর রাজপথে বুলেটের মুখে দাঁড়িয়ে যাওয়া অগণিত সাধারণ মানুষের গল্প।

​দীর্ঘ পনেরো বছর একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে এক দমবন্ধ করা ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে। তারা শৈশব থেকেই দেখেছে চাটুকারিতার জয়জয়কার, দমন-পীড়ন আর নাগরিক অধিকারের ক্রমাগত সংকোচন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ক্ষোভের যে বারুদ জমছিল, রাষ্ট্র তা টের পায়নি। ৫ জুনের আদালতের রায়টা ছিল স্রেফ একটা উছিলা, বিস্ফোরণের আসল কারণ ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অপমান। বৈষম্যের বিরুদ্ধে আর আত্মমর্যাদার দাবিতে সেই ক্ষোভের আগুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস থেকে দেখতে দেখতে ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশের অলিতে-গলিতে।

​জুলাইয়ের সেই দিনগুলোতে আমরা এক চেনা মানচিত্রের সম্পূর্ণ অচেনা এক রূপ দেখলাম। ইতিহাসে হয়তো সবার নাম লেখা থাকবে না; আবু সাঈদ বা মুগ্ধদের পাশে পাশে এমন হাজারো নামহীন মুখ ছিল, যারা কোনো পদক বা স্বীকৃতির আশায় লড়েনি। কেউ ব্যারিকেডে বুক পেতে দিয়েছে, কেউ বুলেটের তোয়াক্কা না করে রক্তাক্ত ভাইকে টেনে তুলেছে ভ্যানে, কেউ স্রেফ পানির বোতল হাতে ছুটে বেড়িয়েছে ক্লান্ত লড়াকু ভাইবোনদের মাঝে। কেউ মুঠোফোনের ক্যামেরায় রাষ্ট্রীয় নির্মমতার প্রমাণ ধরে রেখেছে, কেউবা রাউন্ড বুলেটের খোল কুড়াতে কুড়াতে দেয়ালে এঁকেছে নতুন বাংলাদেশের গ্রাফিতি। রাষ্ট্র যখন একচেটিয়া ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ, তখন বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে লাখো কণ্ঠের একটা স্লোগান পুরো ব্যবস্থার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল—“দেশটা কারো বাপের না।”

​এই লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর সর্বজনীনতা। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা তথাকথিত রাজনৈতিক মেরুকরণ—সব বিভাজন তুড়ি মেরে উড়িয়ে মানুষ নেমে এসেছিল এক সুনির্দিষ্ট ন্যায়ের দাবিতে। এটা শুধু সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের আন্দোলন ছিল না; এটা ছিল নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার লড়াই, স্বাধীন দেশে দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার জেদ।

​আমরা হারিয়েছি অনেক। অনেক মায়ের কোল খালি হয়েছে, বুলেটের আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে কত শত পরিবারের স্বপ্ন। রক্তে রঞ্জিত হয়েছে এই পললভূমি। কিন্তু শাসকেরা ভুলে গিয়েছিল, মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বুলেট দিয়ে চিরকাল স্তব্ধ করা যায় না। একজনের রক্ত যেখানে ঝরে, সেখানে হাজারো ঘুমন্ত বিবেক এক নিমেষে জেগে ওঠে।

​আহমদ ছফা তাঁর ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ গ্রন্থে তরুণদের এই মনস্তত্ত্ব খুব চমৎকারভাবে ধরেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, তরুণেরা যখন কোনো মহৎ সত্যের মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন তারা সমস্ত হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে উঠে যায়; আর তাদের এই নিঃস্বার্থ আত্মদানই সমাজকে পুনর্জন্ম দেয়। জুলাই ছিল আমাদের এই পচে যাওয়া ব্যবস্থার বুকে সেই কাঙ্ক্ষিত পুনর্জন্মের ধাক্কা। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে যে রাষ্ট্রযন্ত্র মানুষকে মেরুদণ্ডহীন আর রাজনীতি-বিমুখ করতে চেয়েছিল, তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই প্রজন্ম প্রমাণ করেছে—হিসাব-নিকাশ করে অন্তত অধিকার আদায়ের লড়াই হয় না।

​জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সার্থকতা কোনো নির্দিষ্ট ক্ষমতার হাতবদলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সবচেয়ে বড় অর্জন আসলে মনস্তাত্ত্বিক। এই দেশের মানুষ, বিশেষ করে তরুণ সমাজ, তাদের হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে। রাষ্ট্র যতই দানবীয় হোক না কেন, জনগণের সম্মিলিত কণ্ঠকে যে চিরতরে স্তব্ধ করা যায় না—এই ধ্রুব সত্যটি এখন এ দেশের মানুষের মজ্জায় ঢুকে গেছে।

​আজ জুলাইকে স্মরণ করার অর্থ কেবল স্মৃতিকাতরতায় ভোগা কিংবা আবেগতাড়িত হওয়া নয়; বরং এক বিশাল ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতাকে কাঁধে নেওয়া। যারা রক্ত দিল, যারা পঙ্গুত্ব বরণ করল, তাদের স্বপ্নের প্রতি সৎ থাকা। এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞা নেওয়া—যেখানে বৈষম্যের জায়গায় প্রতিষ্ঠা পাবে সাম্য, ভয়ের সংস্কৃতির অবসান ঘটিয়ে সুনিশ্চিত হবে মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার।

​জুলাই আমাদের শিখিয়েছে, কোনো নেতৃত্বের আশায় হাত গুটিয়ে বসে থাকতে নেই। জাগ্রত মানুষের সাধারণ সমাবেশই ইতিহাস ও ক্ষমতার সমীকরণ পাল্টে দিতে পারে। আর একটা প্রজন্ম যখন নিজের অধিকারের দাবিতে একতাবদ্ধ হয়, স্বৈরাচারের সবচেয়ে শক্ত দেয়ালটাও তখন বালির বাঁধের মতো ধসে পড়ে।

​জুলাই তাই কেবল ক্যালেন্ডারের একটা মাস নয়; জুলাই একটা চলমান লড়াই, একটা অবিনশ্বর চেতনা আর এক অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতির নাম।


ফাহিমা আক্তার
শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ট্যাগ: ​জুলাই জুলাই গণঅভ্যুত্থান
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp