মার্কিন-ইরান সমঝোতায় মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের আসলে লাভ কতটুকু?

মার্কিন-ইরান সমঝোতায় মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের আসলে লাভ কতটুকু?
২৪ জুন ২০২৬-এ প্রকাশিত আল জাজিরার একটি প্রতিবেদন মূলত একটি বড় প্রশ্নকে সামনে এনেছে—"যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করে পাকিস্তানের আসলে লাভ কী হলো?"

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিতে মধ্যস্থতা করে পাকিস্তানের আসলে লাভ কতটুকু? — এই প্রশ্নটিই এখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রে।সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক রিসোর্টে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, কাতারের প্রধানমন্ত্রী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের যৌথ বৈঠক — এবং তার পরপরই ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের ইসলামাবাদ সফর — বিশ্ব রাজনীতিতে পাকিস্তানের এক নতুন উত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

১. ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পুনরুত্থান
গত কয়েক বছর আন্তর্জাতিক মঞ্চে কিছুটা প্রান্তিক অবস্থানে থাকলেও, মার্কিন-ইরান সংলাপের পর ইসলামাবাদ নিজেকে আবারও একটি অপরিহার্য "আঞ্চলিক খেলোয়াড়" হিসেবে প্রমাণ করেছে।

বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী: ট্রাম্প প্রশাসন যখন কোনো প্রচলিত দেশের ওপর আস্থা রাখতে পারছিল না, তখন পাকিস্তান সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। একই সাথে তারা ইরানের কাছেও গ্রহণযোগ্য ছিল।

কমিউনিকেশন ব্রিজ: কাতার, মিশর, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তির সাথে সমন্বয় করে পাকিস্তান নিজেকে একটি বৈশ্বিক যোগাযোগ সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে।

২. অর্থনৈতিক সমীকরণ: বাস্তবতা বনাম প্রত্যাশা
পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য এই সমঝোতা কিছুটা স্বস্তি আনলেও বিশেষজ্ঞরা একে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান মনে করছেন না।

ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন: মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আটকে থাকা এই প্রকল্প এখন আলোর মুখ দেখতে পারে। এর ফলে পাকিস্তান সস্তা জ্বালানির একটি বড় উৎস পাবে।

হরমুজ প্রণালীর স্থিতিশীলতা: মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ বন্ধ ছিল। এটি স্বাভাবিক হলে বৈশ্বিক তেলের বাজার স্থিতিশীল হবে, যা পাকিস্তানের আমদানি ব্যয় কমাবে।

সীমান্ত বাণিজ্যের প্রসার: বেলুচিস্তান ও ইরান সীমান্তে বাণিজ্য বাধা দূর হলে অর্থনৈতিক স্থবিরতা কিছুটা কাটবে।

৩. কাঠামোগত দুর্বলতা
লাহোরভিত্তিক অর্থনীতিবিদ হিনা শেখের মতে, পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ৩.৭% জিডিপি প্রবৃদ্ধি মূলত যুদ্ধের কারণে আমদানি থমকে যাওয়ার ফল — উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে নয়। পাকিস্তান এখনও আইএমএফের ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল। ৯/১১-পরবর্তী সময়ের মতো এবারও সাময়িক ঋণ মওকুফ বা ছাড় পাওয়া গেলেও, সংকীর্ণ কর ব্যবস্থা ও দুর্বল রপ্তানির মতো মৌলিক অর্থনৈতিক সংকট কেবল কূটনৈতিক সাফল্য দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়।

৪. সবচেয়ে বড় বিজয়ী: পাকিস্তানের সামরিক প্রতিষ্ঠান
এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে দৃশ্যমান ও বড় সুবিধা পেয়েছে পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট।

জেনারেল মুনিরের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: বার্গেনস্টক সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের চেয়ে বেশি হাইলাইট করেছেন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে। ভ্যান্স রসিকতা করে বলেন, গত তিন মাসে তিনি তাঁর স্ত্রী উষা ভ্যান্সের পর সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন জেনারেল মুনিরের সাথে এবং তাঁর "স্টেটসম্যানশিপ ও সামরিক নেতৃত্বের" প্রশংসা করেন।

বৈধতা ও নিয়ন্ত্রণ: এটি প্রমাণ করে যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে সামরিক বাহিনীর প্রচলিত আধিপত্যকে আন্তর্জাতিক মহল — বিশেষ করে ওয়াশিংটন — বাস্তবসম্মত হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছে।

৫. কৌশলগত ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
মিডল ইস্ট অ্যাফেয়ার্স বিশেষজ্ঞ উমের করিমের মতে, পাকিস্তান সফলভাবে রিয়াদ, দোহা, আঙ্কারা ও তেহরানের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেও বৈশ্বিক নীতিনির্ধারণে দেশটির প্রভাব এখনও সীমিত। আলোচনার পথ তৈরি করা আর ওয়াশিংটন বা তেহরানকে তাদের মূল অবস্থান পরিবর্তনে বাধ্য করা — এই দুটো সক্ষমতা এখনও এক নয়।

৬. সাধারণ পাকিস্তানি নাগরিকরা আসলে কী পেল?
ডিফেন্স অ্যানালিস্ট তুঘরাল ইয়ামিনের মতে, যেকোনো কূটনৈতিক সাফল্যের আসল পরীক্ষা হয় দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে তার প্রভাব দিয়ে।
দুই দশক ধরে সহিংসতা ও চরম দারিদ্র্যে ভুগতে থাকা বেলুচিস্তানের মানুষের কাছে যদি এই ভূ-রাজনৈতিক অর্জনের সুফল না পৌঁছায়, তবে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমন করা সম্ভব হবে না। আর যদি এটি কর্মসংস্থান ও জ্বালানি খরচ কমাতে ব্যর্থ হয়, তবে পুরো অর্জনটি কেবল রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদের ক্ষমতার অলিন্দেই আবদ্ধ থাকবে।

৭. সামগ্রিক মূল্যায়ন
মার্কিন-ইরান সমঝোতায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতা নিঃসন্দেহে একটি বড় কৌশলগত অর্জন। এই সাফল্য দেশটিকে তিনটি প্রধান সুবিধা দিয়েছে:
১. আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধি

২. সম্ভাবনাময় জ্বালানি নিরাপত্তা

৩. সামরিক প্রভাবের বৈশ্বিক স্বীকৃতি

তবে এই কূটনৈতিক মূলধন যদি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কার এবং প্রান্তিক অঞ্চলের উন্নয়নে রূপান্তরিত না হয়, তাহলে এটি অতীতের মতোই আরেকটি "মিসড অপরচুনিটি" হিসেবে ইতিহাসে জমা হবে।
ট্যাগ: মার্কিন ইরান চুক্তি পাকিস্তান কূটনীতি আসিম মুনির বার্গেনস্টক ইরান পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন বেলুচিস্তান জেডি ভ্যান্স পাকিস্তান
শেয়ার করুন: Facebook X WhatsApp