ধর্মীয় পোশাকের স্বাধীনতা চাই
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম মুসলিম-প্রধান রাষ্ট্র। সংবিধান আমাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্ম পালনের অধিকার এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেক মুসলিম মেয়েকে শুধুমাত্র হিজাব পরার কারণে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইভা বোর্ড থেকে শুরু করে চাকরির বাজার, এমনকি পরীক্ষার হলে হিজাব পরিহিত নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছে, যা একদমই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা অন্যান্য ক্ষেত্রে পোশাকের স্বাধীনতার কথা বলে থাকি, কিন্তু যখন হিজাবের কথা আসে, তখন স্বাধীনতার সম্মান কেউ করে না। ১লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৫ আন্তর্জাতিক হিজাব দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো হিজাব সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সমাবেশে শিক্ষার্থীরা বলেন, হিজাব আমাদের অধিকার। আমাদেরকে আমাদের কাজ দিয়ে বিবেচনা করুন, পোশাক দিয়ে নয়। নিকাব করে নামাজ পড়বে, রোজা রাখবে, সংসার করবে, রান্না করবে এমন ধারণায় বিশ্বাসী আমাদের সমাজ। তারা বলেন, আমরা হিজাব-নিকাব করেও দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজ যোগ্যতায় দেশের উন্নয়নে কাজ করতে পারি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও হিজাব পরার কারণে মেয়েরা চাকরির জন্য অযোগ্য বিবেচিত হন। তাদের ‘আনস্মার্ট’ বলে উপহাস করা হয়, তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। অথচ যোগ্যতার মাপকাঠি কি কেবল পোশাক?
দক্ষতা, মেধা ও পরিশ্রমের কি কোনো মূল্য নেই? আমরা ফ্যাসিবাদের আমলে দেখেছি যে, যারা হিজাব-নিকাব পরিধান করেছেন, তারা বিভিন্নভাবে হেনস্তার শিকার হয়েছেন। শুধু হিজাব-নিকাবই নয় যারা দাঁড়ি রাখতেন, টুপি পরতেন, তারাও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকরির ভাইভায় হিজাব পরা নারী প্রার্থীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য নানা প্রশ্নাবলী ছোঁড়া হয়। এমনকি পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় বাধার সম্মুখীন হতে হয়, যা মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একজন নারী কী পরবে, কীভাবে নিজেকে উপস্থাপন করবে—এটি সম্পূর্ণ তার ব্যক্তিগত বিষয়। কেউ চাইলেই হিজাব খুলতে বাধ্য করতে পারে না, যেমন কেউ চাইলেই কারো অন্য কোনো পোশাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না। হিজাবকে অনেকেই ভুলভাবে নারীর স্বাধীনতার অন্তরায় হিসেবে দেখে, যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। হিজাব কখনোই নারীর কর্মদক্ষতা বা সামাজিক অংশগ্রহণে বাধা নয়। বরং এটি আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস এর প্রতীক। বিশ্বের বহু সফল নারী—ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রশাসক—হিজাব পরেও তাদের পেশাদারিত্বের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হিজাব পরা নারী শিক্ষা, প্রযুক্তি, রাজনীতি ও ব্যবসায় সফল ভাবে অবদান রাখছে। তাহলে হিজাব বাধা কোথায়?
আসলে সমস্যা হিজাবে নয়, সমস্যা সেই সংকীর্ণ মানসিকতা যারা মনে করে একজন নারী তার পোশাকের ভিত্তিতে বিচারযোগ্য। নারীর স্বাধীনতা মানে তাকে সব ধরনের পোশাক পরতে দেওয়া, কিন্তু তার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পোশাক পরার অধিকার খর্ব করা নয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, লিঙ্গ বা জন্মস্থানের কারণে কারও প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা যাবে না। একইভাবে ৩২ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এর অর্থ হলো, হিজাব পরিধান করা একজন নারীর মৌলিক অধিকার এবং কোনোভাবেই তাকে থেকে বঞ্চিত করা সংবিধান পরিপন্থী। আবার, সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বিশ্বাসের অনুশীলনের অধিকারের কথা বলে। ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস মতপ্রকাশ ও সাংস্কৃতিক বা পরিচয়ের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে, যা পোশাকের মাধ্যামে নিজের পরিচয় বহনের অধিকার রক্ষা করে। যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি হিজাবের কারণে নারীদের প্রতি বৈষম্য করেন, তারা সরাসরি সংবিধানের এই নীতিগুলোর লঙ্ঘন করছেন। সমাজে নারীদের সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার রয়েছে, এবং যদি কোনো নারী তার ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে হিজাব পরতে চান, তবে সেটি তার একান্তই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা।
আজকের বিশ্বে যেখানে আধুনিকতা ও সভ্যতার কথা বলা হয়, সেখানে একজন নারীর স্বাধীনতা খর্ব করা হচ্ছে শুধু তার ধর্মীয় পোশাকের জন্য! এই বৈষম্য কি সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য? পশ্চিমা বিশ্ব যেখানে "ফ্রিডম অব চয়েস" (পছন্দের স্বাধীনতা) নিয়ে গর্ব করে, সেখানে আমাদের সমাজের একাংশ হিজাব পরা অসভ্য বলে অভিহিত করে। এই দ্বৈত নীতি কেন? বাংলাদেশের সংবিধান ও মানবাধিকার সংস্থা ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করার কথা বললে বাস্তব চিত্র তার বিপরীত। আমরা কি তাহলে স্বাধীন নই?
দেশ সংস্কার হচ্ছে। তাই এখনই সময় আমাদের জোরালোভাবে দাবি তোলার—পোশাকের স্বাধীনতা মৌলিক অধিকার, কোনো অনুগ্রহ নয়! হিজাব কোনো বাধা নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ, আমাদের বিশ্বাসের প্রতীক। যারা এ নিয়ে কটাক্ষ বা বৈষম্য সৃষ্টি করেন, তাদের মনে রাখা উচিত—যোগ্যতা পোশাকে নয়, মেধা ও দক্ষতায় প্রমাণিত হয়।
সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীদের প্রতি এই বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির অবসান ঘটাতে হবে। সকলকে মনে রাখতে হবে—হিজাব একজন নারীর অধিকার, কোনো দয়া বা করুণা নয়। এটি আমাদের আত্মসম্মানের প্রতীক। কেউ আমাদের এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারে না, আর আমরা তা হতে দেব না!
ফাহিমা আক্তার
দর্শন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
যুগ্ম সম্পাদক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ফিচার কলাম ও কন্টেন্ট রাইটার্স