কালচারাল ফ্যাসিস্টদের কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে

কালচারাল ফ্যাসিস্টদের কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে
৫ আগস্ট ২০২৪। বাংলাদেশের মানুষের অদম্য গণআন্দোলনের মুখে ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেছে। এক দীর্ঘ ও নিষ্ঠুর অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। কিন্তু উদযাপনের আনন্দের মাঝেও একটি গভীর উদ্বেগ দানা বেঁধেছে: রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও, সাংস্কৃতিক কাঠামোতে এর বিষাক্ত শিকড় এখনো গভীরভাবে প্রোথিত রয়ে গেছে। এই "কালচারাল ফ্যাসিবাদ" হলো এক অদৃশ্য শৃঙ্খল, যা মানুষের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ, সামাজিক আচরণ এমনকি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির অভিব্যক্তিকেও নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে।

সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ কেবল রাজনৈতিক দল বা শাসকের কুশাসন নয়; এটি একটি চিন্তার ব্যবস্থা ও সামাজিক অনুশীলন, যা ফ্যাসিবাদের মূল উপাদানগুলোকে সমাজের সাংস্কৃতিক কোষে প্রোথিত করে।

ঐতিহাসিক উদাহরণ: নাৎসি জার্মানি, ফ্যাসিস্ট ইতালি, ফ্রাঙ্কোর স্পেন বা সামরিক শাসনাধীন লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদের পতনের পরও সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশ দশকের পর দশক ধরে সমাজে টিকে ছিল। শিক্ষাব্যবস্থা, মিডিয়া, পারিবারিক মূল্যবোধ এমনকি প্রতিষ্ঠানগুলোতে এর প্রভাব স্পষ্ট ছিল। এর অপসারণের জন্য দীর্ঘমেয়াদী সাংস্কৃতিক সংগ্রাম ও সচেতনতামূলক প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়েছিল।

বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বীজ বপন হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। ৫ আগস্টের আগে ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থা এই প্রক্রিয়াকে তীব্রতর করেছিল।

সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ দূরীকরণের কৌশল:

সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী, বহুস্তরীয় ও সমাজব্যাপী সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর জন্য নিম্নলিখিত কৌশলগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:

১. শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার।
২. সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ।
৩. মিডিয়া ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিকল্প মিডিয়ার প্রসার: স্বাধীন অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ব্লগ, পডকাস্ট, কমিউনিটি রেডিও ইত্যাদির বিকাশ ঘটানো, যা মতামত প্রকাশের প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে।
৪. প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আইনের শাসন।

৫ আগস্ট ২০২৪-এর বিজয় বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। কিন্তু সত্যিকারের মুক্তি ও টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না, যতক্ষণ না সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের গভীর শিকড় উপড়ে ফেলা হয়। এটি একটি দীর্ঘ, কঠিন ও জটিল প্রক্রিয়া, যা সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই সম্ভব।

বাংলাদেশের মানুষ আগেও দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছে। এবারও তারা সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এগিয়ে যাবে এবং জয়ী হবে বলেই আশাবাদী। সেই নতুন সূর্যোদয়ের প্রত্যাশায় আমাদের এগিয়ে যেতে হবে, একসাথে, দৃঢ়চিত্তে ও অবিচল নিষ্ঠায়। মুক্তির পরেও বন্দিত্ব থেকে মুক্তি মেলে না; মুক্তি আসে চেতনার পরিবর্তন ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের মাধ্যমে। সেই পুনর্জাগরণই হোক আমাদের পরবর্তী লক্ষ্য।